তাওহিদের মূলনীতি - পর্ব চার: তাওহিদ ৩ প্রকার
দেখুন: পর্ব এক, পর্ব দুই, পর্ব তিন, পর্ব চার
চতুর্থ পাঠ: তিন প্রকার
পূর্বের আয়াতে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, আল্লাহ (আযযা ওয়া জাল) মুমিনদের, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, অর্থাৎ যাদের আকিদাহ (বিশ্বাস) সঠিক এবং যারা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী নেক আমল করে, তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করবেন, ঠিক যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদেরও তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, যে দ্বীন নিয়ে আল্লাহ সন্তুষ্ট, যা হলো ইসলাম, এবং তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পরিবর্তন করে দিবেন, “যতক্ষণ তারা শুধু আমারই ইবাদাত করবে এবং ইবাদাতে আমার সাথে আর কোনো শরিক করবে না।” এই আয়াতে আল্লাহ (আযযা ওয়া জাল) কেবল “তারা আমার ইবাদাত করবে” বলেননি, তিনি এখানেই থেমে যাননি, বরং এর পরপরই বলে গেছেন, “এবং ইবাদাতে আমার সাথে আর কোনো শরিক করবে না।”
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে (ইসলাম), যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোনোকিছুকে শরিক করবে না, আর এরপর যারা কুফরি করবে তারাই ফাসিক। [সূরা আন-নূর ২৪:৫৫]
তারা এমন লোক যাদেরকে আমরা জমিনের বুকে প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৪১]
এই আলোচনার পর আমাদের প্রশ্ন জাগবে, “এই তাওহিদ আবার কী যার প্রতি আমরা এতো গুরুত্ব দিই? এই তাওহিদের গুরুত্ব কী এবং এর মর্যাদাই বা কতটুকু?”
“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং কোনো কিছুকে তাঁর শরিক করো না।” এবং সূরা গাফিরে আল্লাহর (আযযা ওয়া জাল) বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন:
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। [সূরা আল-গাফির: ১৪]
তাওহিদের তিন প্রকার
এখন আমরা তাওহিদের (একত্ববাদ) প্রকারগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। তাওহিদ তিন প্রকার যা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কিতাবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাওহিদের এই তিন প্রকারে বিভাজন কারো চিন্তাপ্রসূত বা কারও মতামত থেকে উদ্ভূত নয়, এবং নিছক কোনো পরিভাষা হিসেবেও গণ্য নয়। বরং এই শ্রেণিবিন্যাস আল্লাহর কিতাব থেকেই নেওয়া হয়েছে এবং তা আল্লাহর কিতাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। সুতরাং এই প্রকারগুলোকে অনর্থক, তুচ্ছ বা গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, কুরআন বারবার এই তিন প্রকারের কথা উল্লেখ করেছে—এবং এই তিনটির পর চতুর্থ, পঞ্চম বা ষষ্ঠ আর কোনো প্রকার নেই। কোনো কোনো আলিম তাওহিদকে দুই ভাগে ভাগ করেন, মূলত তাঁরা তাঁদের পরিভাষায় তৃতীয় প্রকারটিকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেন।১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ (একক প্রভুত্ব)
কুরআনে আল্লাহ (তাআলা) যখনই তাওহিদ সম্পর্কে কথা বলেন, তা এই তিন প্রকারের যেকোনো একটির অন্তর্ভুক্ত হয়, এর বাইরে নয়। এর প্রথম প্রকারটি হলো তাওহিদ আর-রুবুবিয়্যাহ, যা আল্লাহর প্রভুত্ব বা প্রতিপালকত্বের ক্ষেত্রে একত্ববাদ। এর সংজ্ঞা হলো—‘আল্লাহর কার্যাবলি ও মালিকানার ক্ষেত্রে একমাত্র তাঁকেই একক হিসেবে গণ্য করা।’ এটাই আল্লাহর প্রভুত্বের তাওহিদ; অর্থাৎ এমন সব কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক মনে করা যা একান্তই আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত, যেমন: সৃষ্টি করা, রিযক দান করা, জীবন দেওয়া, মৃত্যু ঘটানো এবং সৃষ্টিজগতের সকল বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করা। এসবের প্রতিটিই আল্লাহর কাজ যা কেবল তাঁর জন্যই সুনির্দিষ্ট। একজন ব্যক্তির অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা এবং তিনি যা ইচ্ছা তা শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন; তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, জমিন থেকে ফসল উৎপন্ন করেন, জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান ইত্যাদি। এটাই তাওহিদের প্রথম প্রকার।সুতরাং, তাওহিদ আর-রুবুবিয়্যাহ হলো সৃষ্টি, সার্বভৌমত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহকে (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) একক হিসেবে মেনে নেওয়া। অতএব, আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই, আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত মালিক নেই এবং আল্লাহ ছাড়া বিষয়াদির কোনো নিয়ন্ত্রণকারী নেই। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নিরঙ্কুশ, সার্বিক এবং ব্যাপকভাবে এসব বিষয় সম্পাদন করতে পারে না। আল্লাহ, সুবহানাহু ওয়া তাআলা, বলেছেন:
“আর তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা তো খেজুর আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরিক করেছো তা তারা কিয়ামাতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মতো কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।” [সূরা ফাতির: ১৩-১৪] এবং আল্লাহ বলেছেন:
বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে ডাকো। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, জমিনেও নয়। আর এ দুয়ে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়। আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া তাঁর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। অবশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হয়, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে, ‘তোমাদের রব কী বললেন?’ তার উত্তরে তারা বলে, যা সত্য তিনি তাই বলেছেন’ আর তিনি সমুচ্চ, মহান। [সূরা সাবা: ২২-২৩]তো, আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, যারা অজ্ঞ ও নির্বোধ এবং আল্লাহর সাথে ইবাদাহয় শরিক সাব্যস্ত করেছে, আসমান ও জমিনে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া স্বাধীনভাবে তাদের অণুপরিমাণ কোনো কিছুর ওপর মালিকানা নেই। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সাথে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই। সৃষ্টিজগতের কারো কোনোকিছুর ওপর স্বাধীন মালিকানা নেই, এমনকি আল্লাহর সাথে কোনো অংশ নেই, “এবং এ দুটির (আসমান ও জমিন) কোনোটিতেই তাদের কোনো অংশ নেই।” সৃষ্টিজগতের কেউ আল্লাহকে সাহায্য করে না, “আর তাদের মধ্য থেকে তাঁর কোনো সাহায্যকারীও নেই।” কেউ তাঁকে সাহায্য করে না; বরং তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তাঁর সৃষ্টির অমুখাপেক্ষী। “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে কারো সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না”—আর এটাই মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং তাঁর মালিকানার শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর অনুমতি ছাড়া অন্যকে সাহায্য করতে, রক্ষা করতে বা মন্দ ও ক্ষতি দূর করতে তাঁর উপস্থিতিতে সুপারিশ করার ক্ষমতা কারো নেই। তো, এটি মুশরিকদের (অংশীবাদী) সকল পথকে রুদ্ধ করে দেয় যেগুলোর ওপর তারা ভরসা করে—যারা দাবি করে যে তারা মূর্তি বা কবরে শায়িত মৃত ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর কাছে তাদের সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করছে। আর এটা সুষ্পষ্ট, আল্লাহ এসব মূর্তি বা এই মূর্তিপূজকদের (মুশরিক) সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন না—এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্যদের ইবাদাহ ও প্রার্থনা করে, সেসব মুশরিকদের জন্যও তিনি কাউকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন না। মহান আল্লাহ বলছেন:
আর সে ব্যক্তির চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত কে যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামাতের দিন পর্যন্ত তাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহবান সম্পর্কে উদাসীন। আর যখন কিয়ামাতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে তখন তারা হবে এদের শত্রু এবং তারা এদের ইবাদাহ অস্বীকার করবে। [সূরা আল-আহকাফ: ৫-৬]সুতরাং তাওহিদ আর-রুবুবিয়্যাহ হলো তিনটি বিষয়ে একমাত্র আল্লাহকে একক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া: সৃষ্টি, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ। আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই, আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত মালিক নেই এবং আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টিজগতের বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণকারী আর কেউ নেই। সৃষ্টি যদি কোনো নিয়ন্ত্রণের দাবি করে, তবে তা অপূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিপূর্ণ এবং তা কখনোই স্বাধীন নয়—তারা যা কিছুর অধিকারী তা কেবল আল্লাহরই দান। মানুষ কোনো কিছু তৈরি বা নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু তা আল্লাহর সৃষ্টির মতো নয়; কারণ আল্লাহ কোনো কিছু ছাড়াই অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন। মানুষ (বা অন্য কোনো সৃষ্টি) শূন্য থেকে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, তারা কেবল আল্লাহর তৈরি উপাদানগুলো ব্যবহার করে কোনো কিছু জোড়া দিতে বা নির্মাণ করতে পারে; যেমন একজন কাঠমিস্ত্রি কাঠের টুকরো খোদাই করে দরজা তৈরি করে। এই কারিগররা শূন্য থেকে কোনোকিছু সৃষ্টি করে না, বরং তারা আল্লাহর সৃষ্ট কাঁচামাল ব্যবহার করে মাত্র। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল বলেছেন:
হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, তা মনোযোগের সাথে শোনো: তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও এবং মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও অন্বেষণকৃত কতই না দুর্বল। তারা আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দেয়নি যেমন মর্যাদা দেওয়া উচিত ছিল, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমতাবান, পরাক্রমশালী। [সূরা আল-হাজ্জ: ৭৩-৭৪]অনুরূপভাবে, একজন ব্যক্তি কোনোকিছুর মালিকানা লাভ করতে পারে, যেমন আল্লাহ বলেছেন:
“তবে তাদের স্ত্রী ও তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে তারা ছাড়া, নিশ্চয়ই এতে তারা নিন্দিত হবে না।” [সূরা আল-মুমিনুন: ৬] এবং তিনি, আযযা ওয়া জাল, বলেছেন:
একইভাবে, একজন মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে; সে তার মালিকানাধীন জিনিসের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, সে তার পরিবার বা শ্রমিকদের ওপর কর্তৃত্ব খাটায়। তবে তার এই নিয়ন্ত্রণ সীমিত, অপূর্ণাঙ্গ এবং ত্রুটিপূর্ণ; এটি কখনোই ব্যাপক নয়। তার যা ইচ্ছা তা করার মতো পূর্ণ সক্ষমতা, শক্তি বা স্বাধীনতা নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা হলো পূর্ণাঙ্গ এবং তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন।
সুতরাং, এটি আল্লাহর প্রভুত্বের (রুবুবিয়্যাহ) প্রকারটি স্পষ্ট করে। মক্কার মুশরিকরা এই প্রকারটি অস্বীকার করেনি। তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সংকোচ ছাড়াই আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করতো। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ অতঃপর তারা কীভাবে বিমুখ হয়?” [সূরা আয-যুখরুফ: ৮৭] এবং তাঁর বাণী:
অতএব, আল্লাহর প্রভুত্বের (আর-রুবুবিয়্যাহ) স্বীকৃতির পাশাপাশি অবশ্যই ইবাদাহর ক্ষেত্রেও একমাত্র তাঁকে একক হিসেবে গণ্য করতে হবে। ইসলামে বিশ্বাসী দাবিদার অনেকেই আল্লাহর প্রভুত্ব বা রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করে, কিন্তু এরপর তারা তাদের ইবাদাতকে আল্লাহ এবং কবরে শায়িত নেক ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। ফলে তারা কবরের মৃতদের কাছে প্রার্থনা করে আবার আল্লাহর কাছেও প্রার্থনা করে—আর এটিই হলো আল্লাহর ইবাদাতে অন্যকে শরিক করা। যখন তাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তারা উত্তর দেয়, “আমরা এই মৃত নেককার ব্যক্তিকে আমাদের এবং আল্লাহর মাঝে সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করছি, তাই আমরা তাঁকে ডাকছি।” এটাই শির্ক।
২. তাওহিদুল-উলুহিয়্যাহ (ইবাদাহ)
দ্বিতীয় প্রকার হলো, আল্লাহকে ইবাদাতের ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্য ইলাহ (উপাস্য) হিসেবে এককভাবে সাব্যস্ত করা (তাওহিদ আল-উলুহিয়্যাহ), অর্থাৎ ইবাদাতের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করা (একে তাওহিদ আল-ইবাদাহও বলা হয়)। এই দুটি পরিভাষা মূলত একই প্রকারকে নির্দেশ করে। এটি হলো বান্দার নিজ আমলের মাধ্যমে আল্লাহকে একক হিসেবে সাব্যস্ত করা। অর্থাৎ, বান্দা নিজে তার সকল ইবাদাত ও প্রার্থনা কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদন করবে। তা প্রথম প্রকার (রুবুবিয়্যাহ) থেকে ভিন্ন; কারণ প্রথমটি ছিল আল্লাহর নিজস্ব কার্যাবলির ক্ষেত্রে তাঁকে একক মানা, আর দ্বিতীয়টি হলো বান্দা তার নিজের আমল বা কাজগুলোকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত করার মাধ্যমে তাঁকে একক সাব্যস্ত করবে। এসব এমন আমল যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে, যেমন: দোয়া (প্রার্থনা), খাওফ (ভয়), রাজা (আশা), রাহবাহ (ভীতি), রাগবাহ (আকাঙ্ক্ষা), তাওয়াক্কুল (ভরসা ও নির্ভরতা), আল-ইস্তিকামাহ (অবিচল থাকা), ইস্তিগাসাহ (উদ্ধার বা সাহায্য প্রার্থনা), আয-যাবহ (জবেহ, জবাই বা কুরবানি), আন-নাযর (মানত করা), সালাত (নামাজ), সুজুদ (সিজদাহ), রুকু (ঝুঁকা) এবং অন্যান্য ইবাদাহ। এই আমলগুলো কে করে? আল্লাহর বান্দা এসব সম্পাদন করে। এসব আমল অবশ্যই আল্লাহর উদ্দেশ্যে হতে হবে—অন্যথায় সে তাওহিদ লঙ্ঘন করেছে। এসব বান্দার সেসব আমল যা সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করবে না। সুতরাং, এটা আবশ্যক যে ইবাদাহর সব ধরন কেবল আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার জন্যই হতে হবে—এবং এর কোনো অংশই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদন করা যাবে না। এটিই হলো ‘তাওহিদ আল-ইবাদাহ’, যাকে কখনো কখনো ‘তাওহিদ আল-উলুহিয়্যাহ’ বলা হয়। তাওহিদ আল-ইবাদাহ মানে ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহকে একক সাব্যস্ত করা, আর তাওহিদ আল-উলুহিয়্যাহ মানে মহান আল্লাহকে আপনার ইবাদাহর একমাত্র ‘ইলাহ’ বা উপাস্য হিসেবে মানা। মহান আল্লাহ বলেছেন:আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওয়াহিই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর। [সূরা আল-আম্বিয়া: ২৫]আল্লাহই একমাত্র উপাস্য (ইলাহ), আর তাঁর ইবাদাহ দুটো স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: ভালোবাসা ও মাহাব্বাহ এবং ভয় ও শ্রদ্ধা। ভালোবাসার সাথে যুক্ত হয় আশা ও প্রত্যাশা, এবং আল্লাহর হুকুম-আহকাম পূর্ণ করা—এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ জাল্লা ওয়া আলার সন্তুষ্টি ও তাঁর পুরস্কার লাভের চেষ্টা করে। আর দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো ভয় ও আল্লাহর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা বা সম্মান—এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিত্যাগ করে। সে আল্লাহকে ভয়ে ভীত থাকে, এবং তা তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির ভয়ে হারাম কাজগুলো থেকে দূরে রাখে।
আমাদের আরও জানা উচিত যে, প্রত্যেক ইবাদাহ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য:
প্রথমত: তা শুধু আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ ও আন্তরিকভাবে হতে হবে।
দ্বিতীয়ত: ইবাদাতটি অবশ্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেভাবে পালন করেছেন ঠিক সে অনুযায়ী পালন করতে হবে, এতে তাঁর আদর্শ থেকে কোনো ধরনের বিচ্যুতি আনা যাবে না।
অতএব, ইবাদাহর দুটো স্তম্ভ ও দুটো শর্ত রয়েছে। স্তম্ভদ্বয় হলো ভালোবাসা ও ভক্তি। আর শর্তদ্বয় হল একমাত্র আল্লাহর ইবাদাহয় একনিষ্ঠতা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের অনুসরণ।
ইবাদাহ হবে একনিষ্ঠতার সাথে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য:
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একক অনুসরণ করার প্রমাণ হলো নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণী: ‘‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে কোনো নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।’’ [সহিহুল বুখারি ২৬৯৭, মুসলিম ১৭১৮] এর অর্থ হলো, তার ইবাদাহ এ কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শ ও তাঁর অনুসরণের শর্ত পূরণ করতে তা ব্যর্থ হয়েছে।
আর আজকাল আমরা যখন মুসলিমদের মধ্যে অনেকের অবস্থা দেখি, আমরা দেখতে পাই যে তারা আল্লাহর সঠিক ও বিশুদ্ধ তাওহিদের ওপর নেই। কেউ কেউ আছে যারা কবরের মৃত ব্যক্তির ইবাদাত করে এবং তাদের কাছে দোয়া করে, এই বিশ্বাসে যে তারা হয়তো তাদের ডাকে সাড়া দেবে কিংবা তাদের ডাক রবের কাছে পৌঁছে দেবে। ফলে কল্যাণ লাভের আশায় ও অশুভ জিনিস দূরীকরণের উদ্দেশ্যে সেখানে তারা কবরগুলোর তাওয়াফ করে ও সিজদাহ করে। আবার কেউ কেউ তাদের নেতাদের (গোত্রীয় বা ধর্মীয়) ইলাহ বানিয়ে নেয় এবং তাদেরকে আল্লাহর মতো মর্যাদা দেয়, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা হালাল করাতে তাদের আনুগত্য করে, অথবা আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তা নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করে। এটা তাদের নেতাদেরকে রব বানিয়ে নেওয়া। আল্লাহ, আযযা ওয়া জাল, বলেছেন:
“তারা (ইহুদি ও খ্রিস্টান) আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদেরকে তাদের রবরূপে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসিহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নাই। তারা যে শরীক করে তা থেকে তিনি কত না পবিত্র।” [সূরা তাওবাহ: ৩১] সাহাবি আদি ইবনু হাতিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নবিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: “তারা অবশ্য তাদের পূজা করতো না। তবে তারা কোনো জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলতো তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিতো। আবার তারা কোনো জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলতো তখন নিজেদের জন্য সেটাকে হারাম বলে মেনে নিতো।” [আত-তিরমিজি, ৩০৯৫]
তাওহিদের এই শাখাটিতেই মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিরুদ্ধে চরম ও সক্রিয় বিরোধিতা করেছিল। ইবাদাতের তাওহিদ নিয়েই তারা বলেছিল:
নোট: আলিমদের পরিভাষায় একে কখনও ‘তাওহিদুল আমালি’ (একমাত্র আল্লাহকে তাঁর সকল ইবাদাত ও আনুগত্যের জন্য একক সাব্যস্ত করা) বলা হয়, অথবা ‘তাওহিদুল কাসদ’ (একমাত্র আল্লাহর জন্যই সকল ইবাদাতের নিয়ত করা), এবং কখনও কখনও একে ‘তাওহিদুত তাআহ’ (আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক সাব্যস্ত করা) বলে উল্লেখ করা হয়।
৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (নাম ও গুণাবলি)
তৃতীয় প্রকারটি হচ্ছে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁর এককত্ব। অর্থাৎ, তাঁর নাম ও গুণাবলি শুধুমাত্র তাঁর জন্যই সাব্যস্ত করা। তা হলো কুরআনে আল্লাহ নিজের জন্য যে নাম ও গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন এবং আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তা তাদের বাহ্যিক অর্থে সাব্যস্ত করা; সেগুলোকে অস্বীকার না করে, বিকৃত না করে, ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করে, ‘কীভাবে’ এই প্রশ্ন না করে বা সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য স্থাপন না করে। আর বান্দার উপর কর্তব্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা উল্লেখ থেকে বিরত থেকেছেন, সে সম্পর্কে নিবৃত্ত ও নিরব থাকা এবং নিজেকে শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা এবং আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সংবলিত ওয়াহির নুসুসে (texts) যা কিছু সাব্যস্ত হয়েছে, তার সবকিছুর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। একইভাবে, আল্লাহ নিজের ব্যাপারে যা কিছু অগ্রাহ্য করেছেন অথবা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর থেকে যে সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা অগ্রাহ্য করেছেন, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করা।তাওহিদের এই প্রকারকে কেন্দ্র করেই মুসলিম উম্মাহ শুরু থেকেই বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে দলটি সত্যের উপর অটল থেকেছে তাঁরা হলো সালাফ (সাহাবাহ এবং যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন), আর তাঁরাই হচ্ছেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। তাঁরা আল্লাহর জন্য সে সকল নাম ও গুণাবলি সাব্যস্ত করে, যা তিনি কুরআনে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন অথবা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জবানে বর্ণিত হয়েছে। আর এই সাব্যস্তকরণে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য নেই। আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, অর্থাৎ প্রথম যুগের সালাফদের অনুসারীরাই আল্লাহর জন্য তা অস্বীকার করে, যা তিনি নিজের জন্য অস্বীকার করেছেন, এবং তাঁরা তাঁর গুণাবলি, তাঁর নামসমূহ ও সেসবের প্রকৃত অর্থ অস্বীকার করে না; কোনো রূপক অর্থ বা উদ্ভাবিত বিকল্প ব্যাখ্যা আরোপ না করে। একইভাবে, আহলুস সু্ন্নাহ ওয়াল জামাআহ সে বিষয়েও নীরব থাকে, যা সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নীরব থেকেছেন; তারা জ্ঞান (ইলম) ছাড়া আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলে না। এই নীতিমালাই সত্যের অনুসারীদেরকে সত্যিকার হিদায়াহর ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখে; তারা ইলমের সাথে কথা বলে, অনুমান ও নব আবিষ্কৃত বিষয় (বিদআত) দিয়ে নয়।
সুতরাং, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ আল্লাহর জন্য তাঁর নিজ কতৃক কর্তৃক সাব্যস্ত করা সকল গুণাবলিই সাব্যস্ত করে। যেমন:
জীবন (আল-হায়াত)
জ্ঞান (আল-ইলম)
ক্ষমতা (আল-কুদরাহ)
শ্রবণ (আস-সামা)
দর্শন (আল-বাসর)
ইচ্ছা (আল-ইরাদাহ)
বাকশক্তি (আল-কালাম)
পরাক্রম (আল-ইযযাহ)
প্রজ্ঞা (আল-হিকমাহ)
দয়া (আর-রাহমাহ)
বিস্ময় (আল-উজুব)
হাসি (আদ-দাহাক)
এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ তাঁর জন্য নিম্নোক্তগুলোও সাব্যস্ত করে:
চেহারা (আল-ওয়াজহ)
দুই হাত (আল-ইয়াদাইন)
দুই চোখ (আল-আইনাইন)
পা (আল-কাদাম)
পায়ের সম্মুখভাগ (আস-সাক)
সালাফদের যুগের পর, আহলুল কালাম (বিতর্ক ও বাগবিতণ্ডাপ্রবণ লোকেরা) আল্লাহর নাম ও গুণাবলি নিয়ে লম্বা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়, ওয়াহি ও সুস্থ যুক্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। একটি দল আবির্ভূত হয় যারা আল্লাহর নামগুলো তো স্বীকার করতো কিন্তু তাদের অর্থ ও গুণাবলিকে প্রত্যাখ্যান করতো। তারপর একটি দল ছিল যারা নামগুলো স্বীকার করতো, কিন্তু তাদের অর্থ বিকৃত করতো এবং জীবন, জ্ঞান ও ক্ষমতাসহ সাতটি গুণ ছাড়া বাকি সব গুণাবলিকেই প্রত্যাখ্যান করতো। আরও একটি দল ছিল যারা সব নাম ও সব গুণাবলিকেই অস্বীকার করতো, এবং আরেকটি দল এমন ছিল যারা গুণাবলি স্বীকার ও অস্বীকার উভয়ই প্রত্যাখ্যান করতো। তারা সবাই সাহাবাহ ও তাঁদের অনুসারীদের পথ থেকে বিচ্যুত হয় এবং এর ফলে বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের সৃষ্ট ভ্রান্ত ধারণার কারণে দ্বীন থেকে বের হয়ে কুফরি পড়ে যায়, আর অন্যরা যদিও ইসলামের মধ্যেই থাকে কিন্তু তা ভয়াবহ পথভ্রষ্টতার ওপর।
সত্য হলো সেই পথ, যার ওপর সালাফরা ছিলেন এবং তাঁরাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। কুরআন ও সুন্নাহয় বহু নুসুস আছে যাতে আল্লাহর মহান ও পরিপূর্ণ গুণাবলি বিস্তারিতভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাই, আমাদের কর্তব্য হলো সেসব গুণাবলি তাঁর মহিমার উপযুক্তভাবে সাব্যস্ত করা। অন্যদিকে, অপূর্ণতা ও ত্রুটির গুণাবলি আল্লাহ তাআলার থেকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা হয়েছে। আমাদের উপর কর্তব্য হল সেসব গুণ তাঁর থেকে নাকচ করা এবং সেসব ত্রুটির বিপরীত পরিপূর্ণ গুণাবলি একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করা, যিনি সর্বোত্তম ও সর্বাধিক পরিপূর্ণ। আর এটাই আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্য পালনীয় হক (অধিকার)।
সুন্নাহর উলামারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলির তাওহিদ বিষয়ে সালাফদের বুঝ নিয়ে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, আল-আজুররি, ইবনু বাত্তাহ, আবু দাউদ, আত-তিরমিজি, আল-বুখারি, আদ-দারিমি, ইবনু কুদামাহ, ইবনু খুযাইমাহ, ইবনু মানদাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়িম প্রমুখ। বিশেষত শেষোক্ত মধ্যযুগের দুই মহান আলিম এ বিষয়ে এমন কিছু অত্যন্ত উপকারী গ্র্রন্থ রচনা করেন, যা প্রারম্ভিক সালাফদের যুগের পর থেকে শতাব্দীকাল ধরে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পথভ্রষ্টতার খণ্ডনও পেশ করে।
পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে যারা লেখালেখি করেছে, তাদের অনেকেই প্রভাবশালী বিদআতি আকিদাহ যেমন আশআরিয়্যাহ, মুতাযিলাহ, মাতুরিদিয়্যাহ ও জাহমিয়্যাহ মতবাদের অন্ধ অনুসরণের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এই দলগুলোর গোঁড়া অনুসারীদের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হাজির করার পরও তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মতে, কুরআন ও সুন্নাহয় যা কিছু রয়েছে এবং যা সাহাবা ও তাদের অনুসারীদের বুঝের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর বাধ্যতামূলক। পরবর্তী যুগের মানুষদের বক্তব্যের কারণে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এর বিরোধিতা করলে তার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। এর কারণ হলো, কোনো ব্যক্তি (এমনকি একজন আলিমও) এমন ভুল করতে পারেন যার জন্য তিনি ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারেন, কারণ সত্য তার কাছে স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু তাঁর পাঠক ও অনুসারী যাদের কাছে সত্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের বুঝের ভুল পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের পক্ষে এমন মারাত্মক ভ্রান্তিগুলোর জন্য অজুহাত দেওয়া জায়েয নয়।
তাওহিদুল আসমা ওয়াস-সিফাতের ক্ষেত্রে সালাফ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, যারা আহলুল হাদিস নামে পরিচিত, তাদের ইলম (জ্ঞান) কুরআন-হাদিসের অবিকৃত নুসুসের (texts) ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে বিবেক-বুদ্ধির কোনো স্থান নেই, যা কেবল গুণাবলি সঠিকভাবে সাব্যস্ত করা এবং নুসুস (প্রমাণিত দলিল) সঠিকভাবে বোঝার সাধারণ সীমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিবেক সাধারণভাবে একজনকে এই দিশা দেয়, আল্লাহকে তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলি দ্বারা বর্ণনা করা হয় এবং তিনি আযযা ওয়া জাল সকলপ্রকার ত্রুটি ও দোষ থেকে মুক্ত। কিন্তু, বিবেক এই গুণাবলির বিস্তারিত স্বরূপ উপলব্ধি করতে অক্ষম। তাই এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ শুধুমাত্র কিতাব ও সুন্নাহতেই পাওয়া যায়। সুতরাং, যেহেতু আল্লাহর নাম ও গুণাবলির বিস্তারিত বিবরণ কুরআন ও সুন্নাহতে বিদ্যমান, তাই আমাদের জন্য অপরিহার্য হলো আমরা যেন তা থেকে চুল পরিমাণও সরে না আসি। আমাদের নিজেদের ইচ্ছা, প্রবৃত্তি বা বিবেক দিয়ে আল্লাহর সত্তা (যাত), তাঁর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং, একজন মুসলিমের ওপর কর্তব্য হলো কিতাব ও সুন্নাহয় যা এসেছে; আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অর্থ বিকৃত না করে, তিনি যা সাব্যস্ত করেছেন তা অস্বীকার না করে, তাঁর গুণাবলি ‘কেমন’ তা নিয়ে আলোচনা না করে এবং সেগুলোকে সৃষ্টজীবের সাথে সাদৃশ্য না করে তা গ্রহণ করা।