তাওহিদের মূলনীতি – পর্ব তিন: তাওহিদকে অবহেলা করা লাঞ্ছনা ডেকে আনার নামান্তর

সালাফি দাওয়াহ বাংলা

দেখুন: পর্ব এক, পর্ব দুই, পর্ব তিন


তৃতীয় পাঠ: তাওহিদকে অবহেলা করা লাঞ্ছনা ডেকে আনার নামান্তর


মুসলিমদের তাদের শত্রুদের হাতে অপদস্থ হওয়ার কারণ নিয়ে আমরা গত পর্বে আলোচনা করেছি। আমরা যখন মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, আমরা দেখতে পাই, নিজেদেরকে যারা মুসলিম বলে দাবি করে তাদের বেশিরভাগই ইসলাম অনুযায়ী জীবনযাপন করে না। তারা দ্বীনের ওপর অবিচল নেই; তাদের কোনো মজবুত ভিত্তি নেই। কেবল তারা বাদে যাদেরকে আল্লাহ তাঁর রহমতে (দয়া) হিদায়াহর দিশা দিয়েছেন।

অনেক মুসলিম নামেমাত্র মুসলিম—তাদের নাম আহমাদ, মুহাম্মাদ, আব্দুল্লাহ, আব্দুর রাহমান ইত্যাদি মুসলিম নাম হলেও আমরা যখন তাদের আকিদাহ-বিশ্বাসের দিকে তাকাই; তখন দেখি তা কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী। বহু মুসলিমই তাদের ইবাদাহ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও প্রতি উৎসর্গ করে—ইবাদাতে তারা নিজেদেরকে মৃত পীর-আউলিয়া, দরগাহ ও মাজারের সাথে সম্পৃক্ত করে; যাদের তারা আল্লাহর অলি (বন্ধু) বা সালিহিন (নেক বান্দা) বলে ডাকে। ফলে তারা এসব কবরকে পবিত্র জ্ঞান করে, সেগুলোর ওপর মাজার ও গম্বুজ নির্মাণ করে এবং অতঃপর সেসবের ভেতর যারা আছে তাদের কাছে সাহায্য ও সুপারিশ কামনা করে দোয়া করে। এটা শির্‌কের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

এছাড়াও আমরা যখন ইসলামি উম্মাহর দিকে তাকাই, তখন দেখি অনেক মুসলিমই সালাত (নামাজ) পড়ে না, যাকাত দেয় না, রোজাও রাখে না—আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর যে ফরজগুলো অর্পণ করেছেন, তারা সেগুলো প্রতিষ্ঠা করে না। এ কারণেই আল্লাহর সাহায্য তাদের থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তারা শত্রুদের আক্রমণও প্রতিহত করতে পারছে না। কারণ, আল্লাহর ফরজ বিধানগুলো তারা পালন করে না, ফলে আল্লাহর সমর্থন থেকে তারা বঞ্চিত। অনেক মুসলিমেরই এমন অবস্থা—তারা তাদের দ্বীন হারিয়ে ফেলেছে, আর আল্লাহও (আযযা ওয়া জাল) তাদেরকে গুমরাহিতে ফেলে রেখেছেন।

সুতরাং, মুসলিমদেরকে যেসব যন্ত্রণার শিকার হতে হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদাহ ও তাওহিদের প্রতি তাদের অবহেলা। অনেক মুসলিমই তাওহিদ বোঝে না—তা কী অর্থ বহন করে, কীভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সে জ্ঞান তাদের নেই। ফলে তারা শির্‌কে পতিত হয়।

আবার অনেকে আছে যারা সরাসরি শির্‌ক করে না, তবে এ যুগে শির্‌ক থেকে নিষেধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ নয় মনে করে তারা এর বিরুদ্ধে কথা বলে না। আপনি অনেক ইসলামি দাঈ দাবিদার লোকেদের দেখবেন যারা মাজারে বসা এবং মৃতদের ডাকা, আর তাদের চারপাশে তাওয়াফ করাকে শির্‌ক হিসেবে বিবেচনা করে না। এ বিষয়টি আমি পরবর্তী কোনো অধ্যায়ে উল্লেখ করবো, ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং, এসবই উম্মাহর এই দুর্দশার এবং মুসলিমদের এই শাস্তি ও লাঞ্ছনার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ। ইমাম মালিক ইবন আনাস (রাহিমাহুল্লাহ, মৃ. ১৭৯ হিজরি)-এর একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, “এই উম্মাহর শেষভাগকে শুধুমাত্র তা দিয়েই সংশোধন করা যাবে, যার মাধ্যমে এর প্রথমভাগ সংশোধিত হয়েছিল।” নিঃসন্দেহে উম্মাহ আজ ভোগান্তির শিকার এবং মুসলিমরা অত্যাচার ও লাঞ্ছনায় পর্যবসিত, কিন্তু এই ক্লেশ-যন্ত্রণা ও অপমান ততক্ষণ পর্যন্ত দূর হবে না, যতক্ষণ না মুসলিমরা ইসলামের সেই প্রাথমিক যুগের দিকে ফিরে যাচ্ছে—যেমন ছিল নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) যুগ।


রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যখন তোমরা সুদের লেনদেনে জড়াবে, গরুর লেজ ধরে (পশু পালন ও কৃষি নিয়ে) বসে থাকবে, জমি চাষাবাদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ (Striving) করা ছেড়ে দেবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর অপমান নাযিল করবেন।” এটা কখন হবে? যখন মুসলিমরা এসব অবাধ্যতা ও গুনাহর কাজে লিপ্ত হবে। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে লাগলেন, “আল্লাহ এই লাঞ্ছনা ততক্ষণ পর্যন্ত দূরীভূত করবেন না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসছো।” আর দ্বীনের শুরু হয় তাওহিদ, একমাত্র আল্লাহর ইবাদাহ, ঈমানের স্তম্ভসমূহ, সালাত এবং ইসলামের অন্যান্য ভিত্তির মাধ্যমে। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেননি যে, “যতক্ষণ না তোমরা বিদ্রোহ করছো, সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছো, অথবা রাস্তায় বিক্ষোভ ও মিছিল করছো এবং সংসদে লবিং করছো” ইত্যাদি। বরং তিনি দ্বীনের মৌলিক বিষয় দিয়েই শুরু করেছেন।


তারা যদি কেবল তাদের দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করে, কিতাব ও সুন্নাহতে বর্ণিত আকিদাহকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআন ও সুন্নাহ) সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরে—একতাবদ্ধ থাকে এবং বিভক্ত না হয়, তাহলে তাদের ওপর যে মুসিবত আপতিত হয়েছে, তা দূরীভূত হয়ে যাবে। ঠিক যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন যে আল্লাহকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।”


আল্লাহ (আযযা ওয়া জাল) বলেন:

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
তারা এমন লোক যাদেরকে আমরা জমিনের বুকে প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর সকল কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৪১]

সুতরাং, আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মুমিন ও মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থন তখনই লাভ করবে, যখন তারা এই মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যেগুলোর কথা আল্লাহ এই আয়াতে উল্লেখ করেছেন। সেগুলো না থাকলে আল্লাহর সাহায্যও আসবে না। আর সেই বিষয়গুলো হলো: তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে।

এসবই মূলভিত্তি। কিন্তু আজকের মুসলিমদের মধ্যে এ বিষয়গুলোর কোনটি বিদ্যমান? মুসলিম ঘরগুলোতে সালাত কোথায়? বহু মুসলিম তো সালাতই পড়ে না! যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, তাদের সঠিক আকিদাহই বা কোথায়? তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয়ের আশা করে, চায় এই লাঞ্ছনা দূর হোক; কিন্তু তারা সালাত পড়ে না, যাকাত দেয় না, তাদের অনেকে রামাদানের রোজাও রাখে না, আর হজের কথা তো তাদের চিন্তার একেবারেই বাইরে। তার চেয়েও বড়ো কথা, তাদের সহিহ আকিদাহই নেই। তারা তা জানে না, পড়ে না, শেখে না। অথচ তারাই ইসলামের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে এবং আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করে।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে (ইসলাম), যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোনোকিছুকে শরিক করবে না, আর এরপর যারা কুফরি করবে তারাই ফাসিক। [সূরা আন-নূর ২৪:৫৫]

তো, আল্লাহর এই ওয়াদা পূরণের শর্তগুলো কী কী? আল্লাহ বলছেন, তোমাদেরকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবে (সঠিক আকিদাহ নিয়ে) ঈমান আনবে এবং সৎ কাজ করবে; তখনই মুসলিমদেরকে আল্লাহ স্থিতি ও নিরাপত্তা দান করবেন। আর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ আরও দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন: “যতক্ষণ তারা শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে আর কোনো শরিক করবে না।” এই আয়াতটি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মাহর জাগরণের মৌলিক উপায়টি স্পষ্ট করে দেয়।

সুতরাং আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি যে শর্তগুলোর কথা বলেছেন সেগুলো পূরণ না হলে এই বিজয় ও কর্তৃত্ব আসবে না—তাদেরকে ঈমান আনতে হবে, নেক কাজ করতে হবে যা প্রতিষ্ঠিত হবে তাওহিদের ভিত্তিতে: “তারা শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করবে”, এবং তারা শির্‌ক করবে না, “আমার সাথে কোনো শরিক সাব্যস্ত করবে না।”

এটাই হলো তাওহিদ—এই তাওহিদের সাথেই নবি-রাসুলগণ প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং, এই মহান ওয়াদাগুলো শুধুমাত্র তারাই অর্জন করতে পারবে যারা আল্লাহর ইবাদাহ করতে গিয়ে তাঁর সাথে কোনো শরিক না করে তাওহিদকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করবে। আর আল্লাহর ইবাদাহর মধ্যে রয়েছে সালাত (নামাজ), সাওম (রোজা), যাকাত, হজ, দোয়া, আশ্রয় প্রার্থনা, কুরবানি, মানত ইত্যাদি, যেসব একমাত্র আল্লাহর জন্যই সম্পূর্ণরূপে নিষ্ঠার সাথে আদায় করতে হবে।

অতএব, কুরআন ও সুন্নাহকে মানুষের অবশ্যই সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছেন। আর যখন তারা কুরআন ও সুন্নাহকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করবে ও উপলব্ধি করবে, তখনই তারা সত্যকে খুঁজে পাবে। এরপর মুসলিমদের কর্তব্য হলো সেই সত্যের ওপর দৃঢ়ভাবে আমল করা এবং অন্যকেও এর দিকে আহ্বান জানানো (দাওয়াহ দেওয়া), ইসলামে যেসব শির্‌কি ও কুসংস্কারমূলক আমল ও নব আবিষ্কৃত বিদআত বিদ্যমান, সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা, আর শরিয়াহয় অনুমোদিত নয় এধরনের সকল বিক্ষোভ-মিছিল, বিপ্লব, বিদ্রোহ, গণঅভ্যুত্থান ও সশস্ত্র সংঘাতের মাধ্যমে সমাজে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা, যা মুসলিম উম্মাহর কোনো উপকারে আসে না; বরং শুধুই এর ক্ষতি করে।


এই সিরিজের আর্টিকেলগুলো মূলত আল-ইমাম ইবন আল-উসাইমিনের (রাহিমাহুল্লাহ) রচনাবলি এবং আল-আল্লামাহ সালিহ বিন ফাওযান বিন আব্দিল্লাহ আল-ফাওযানের (হাফিযাহুল্লাহ) ‘দুরুস মিনাল কুরআন আল-কারিম’ এবং গুটিকয়েক অন্য উলামাদের স্কলারলি রচনাবলির ওপর ভিত্তি করে রচিত | abukhadeejah.com
পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
কোনো কমেন্ট নেই
কমেন্ট করুন
comment url