সালাফিদেরকে নিষ্ক্রিয়, রাজনৈতিক ও জিহাদি হিসেবে বিভক্ত করা: পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের একটি অগ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিন্যাস ও তার জবাব

সালাফি দাওয়াহ বাংলা
salafidawahbangla
সালাফিদেরকে নিষ্ক্রিয় (Quietists), রাজনৈতিক (Politicos) ও জিহাদি (Jihadists) হিসেবে বিভক্ত করা: পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের একটি অগ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিন্যাস ও তার অসারতার জবাব


﷽


ইমাম আল-আওযাঈ (জন্ম: ৮৮হি, মৃত্যু: ১৫৭হি) থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবি (ﷺ) যেসব কাজ থেকে বিরত থেকেছেন, সেগুলো থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিতেন। তাঁর অভিমত ছিল, নবি যা ছেড়ে দিয়েছেন তা যারা পালন করে, তারা দ্বীনে মিথ্যা বিদআতের সংযোজন করেছে। সুন্নাহর অগণিত ইমাম ও উলামাদেরও এটাই ছিল অবস্থান; যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব যুগ যুগ ধরে আজও নিঃসন্দেহে মুসলিমদের জীবনযাত্রায় প্রবাহমান। সুতরাং, নবি (ﷺ), তাঁর সাহাবাহ এবং প্রথম তিন প্রজন্মের অনুসারীগণের অনুসৃত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজেদের উদ্ভাবিত উপায়ে “ঈমান” চর্চা করা এবং দম্ভভরে এটা দাবি করা যে—“তারা করেননি বলেই যে ভুল হবে, এমন তো কোনো কথা নেই!” —তা কোনো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যই সমীচীন নয়।

ওয়াহির প্রামাণ্য দলিল ও আকিদাহর প্রাথমিক রচনাবলি পর্যালোচনা করলে জানা যায়, সালাফিয়্যাহর অন্যতম মূলনীতি হলো: উম্মাহর সংশোধনের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ যদি বিশেষ কোনো পদ্ধতি, কর্মপন্থা বা উপায়ের নির্দেশনা না দিয়ে থাকেন, তবে তা কোনোভাবেই সালাফিয়্যাহর দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না, বা এর মূলনীতিগুলোর অন্তর্ভুক্ত বলেও গণ্য করা হবে না। মালিক ইবনু আনাস (মৃ. ১৭৯হি) বলেছেন: “এই উম্মাহর পরবর্তী অংশ কেবল তা দ্বারাই সংশোধিত হবে যা এর পূর্ববর্তীদের সংশোধন করেছিল।”
অনেক “অ্যাকাডেমিক”, যারা সালাফিয়্যাহ বোঝার চেষ্টা করে, তারা বর্তমান যুগের সালাফিদের তিনটি দল নিয়ে কথা বলে:

  • ১. নিষ্ক্রিয়/ধর্মপরায়ণ (Quietist/Pietist) সালাফি,
  • ২. রাজনৈতিক (Political) সালাফি এবং
  • ৩. জিহাদি (Jihadist) সালাফি।
অতঃপর তারা সালাফি মতাদর্শ সম্পর্কে নিজেদের মনগড়া ধারণার আলোকে এই তিনটি ধারাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। সালাফিরা (ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞায়) যে তিনটি আলাদা দলে বিভক্ত তাদের এই ধারণাটাই ভুল। কারণ নবি (ﷺ) ও তাঁর সাহাবিরা ছিলেন “এক জামাআত”, অর্থাৎ, ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষায় (Theological terms) “এক দল” বা “একক সংঘ”—আর ‘জামাআহ’ শব্দটির মূল অর্থ এটাই নির্দেশ করে। নবি (ﷺ) নিজেই উল্লেখ করেছেন, তাঁর ইন্তেকালের পর মুসলিমদের মধ্যে বহু দলের আবির্ভাব ঘটবে, যেমনিভাবে নবি মুসা ও ঈসার পরে যথাক্রমে নানা সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছিল। যেমন একটি সহিহ হাদিসে নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) এই দলগুলোর সংখ্যা তিয়াত্তরটি বলে উল্লেখ করেছেন। সেই হাদিসেই তিনি একটি দল/সম্প্রদায়কে “নাজাতপ্রাপ্ত” হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তাদের নামকরণ করেছেন “জামাআহ”। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, “আজ আমি ও আমার সাহাবারা যে বিষয়ের ওপর আছি।” এটাই সেই একক সমষ্টি, যাঁদের ‘সালাফ’ (নেককার/পূণ্যবান পূর্বসূরি) বলা হয়। প্রথম যুগের যেসব প্রজন্ম আকিদাহ ও মানহাজের দিক থেকে সম্পূর্ণ অবিচ্ছেদ্য থেকে তাঁদের অনুগমন করেছেন—পরবর্তীকালে যাঁরা এই সালাফদের পূর্ণ অনুসরণ করেন, তারাও আকিদাহ ও মানহাজে অভিন্ন বা অবিচ্ছিন্ন। ফলে যারা নিজেদের “জামাআহ” বা মূলধারার বলে দাবি করে, অথচ নবি (ﷺ) ও তাঁর সাহাবিদের জীবদ্দশার আদর্শের চরম লঙ্ঘন ও বিরোধিতা করে—তাদের এই দাবির স্বপক্ষে ন্যূনতম কোনো অজুহাত বা সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের সালাফিজম (বা সালাফিয়্যাহ) মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মোটাদাগে যে ভুল করে তা হলো তাদের এই ধারণা যে—কোনো ব্যক্তি বা দল যদি বাহ্যিকভাবে “সালাফি আকিদাহ ও ধর্মতত্ত্ব” স্বীকার করে নেয়, তবে তাদের “জিহাদি ঘোষণাপত্র (ইশতেহার)”, “আধুনিকতাবাদী (Modernist) কর্মপন্থা” বা “রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি” যাই হোক না কেন, তাদের ঢালাওভাবে সালাফি বলে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ, এসব ওয়েস্টার্ন অ্যাকাডেমিকদের মতে, সালাফিয়্যাহ বলতে কেবল একটি নির্দিষ্ট আকিদাহ গ্রহণ করাকে বোঝায়, যা মূলত অদৃশ্য জগতের বিষয়াবলির (আল-গাইব) সাথে সম্পর্কিত—যেমন তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ও কেবল তাঁর ইবাদাহ), আখিরাতের ঘটনাবলি, আল্লাহর অনন্য নাম ও গুণাবলি, কবরের ফিতনাহ (পরীক্ষা), মালাইকাদের প্রতি ঈমান (বিশ্বাস) ইত্যাদি। সালাফিজমের মূল পরিচয় সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে তারা কেবল এই আকিদাগত (বিশ্বাস) দিকটিকেই সামনে রাখে এবং যেসব দলের মাঝে এই “সালাফি ধর্মতত্ত্ব”-এর মিল পাওয়া যায়, তাদের সবাইকেই সালাফিদের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। আর বাদবাকি পার্থক্যকে তারা গৌণ বা অনাবশ্যক মনে করে। ফলে শাসনব্যবস্থা, বিদ্রোহ, খিলাফাহ, বিদআত, জিহাদ, ওয়ালা ও বারা (আনুগত্য ও বিমুখতা), তাকফির, ইকামাতুল-হুজ্জাহ (প্রমাণ উপস্থাপন) ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোতে মৌলিক বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও এসব অ্যাকাডেমিকদের কৃত্রিম (কল্পিত) সংজ্ঞায় তা সালাফিজমের তথাকথিত “যৌথ ভিত্তির” ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়ায়, এই চাপিয়ে দেওয়া সংজ্ঞার কারণে সালাফি আকিদাহ ও নববি কর্মপদ্ধতির (মানহাজ) একটি বড় অংশ সালাফিয়্যাহর সংজ্ঞায়ন থেকেই বাদ পড়ে যায়।

নবি (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর প্রথম তিন থেকে পাঁচ শতাব্দীর মধ্যে সুন্নাহর উলামারা যেসব আকিদাহর গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন—যেমন আবু হাতিম, আবু যুরআহ, সাবুনি, লালিকাঈ, খাল্লাল, তাহাওয়ি, আহমাদ ইবনু হাম্বল, আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি, ইবনু আবি বকর আস-সিজিস্তানি, ইবনু বাত্তাহ, আল-বারবাহারি, বুখারি, মারওয়াযি প্রমুখের রচনাবলি—কেউ যদি সেগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তখন সে স্পষ্ট ও সুনিশ্চিতভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে যে, সালাফদের আকিদাহ কেবল অদৃশ্য বিষয়ের গুটিকয়েক বিশ্বাস—যেমন: আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, কবরের ঘটনাবলি, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁদের আকিদাহর গ্রন্থগুলোতে শাসনব্যবস্থা, সশস্ত্র বিদ্রোহ, বিদআত, ধর্মদ্রোহিতা, যিনদিক ও আহলুল-বিদআতের সাথে আচরণের নীতিমালা, নুসুস (নস/পাঠ) বোঝার পদ্ধতি, ওয়াহির নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে আকল-বুদ্ধির অবস্থান, অত্যাচারী শাসনব্যবস্থা ও সরকারের সাথে আচরণের নিয়ম, তাকফির, ওয়ালা ও বারা ইত্যাদি বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করতেন। নিশ্চয়ই এই ধর্মতাত্ত্বিক/আকিদাহগত/কর্মপদ্ধতিমূলক গ্রন্থগুলো সালাফিদের জন্য মৌলিক পাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এসব সংকলন থেকেই আহলুস সুন্নাহ/সালাফিয়্যাহ তাদের মূল (Core) বিশ্বাস, তাদের আকিদাহ, তাদের মানহাজ, তাদের উসুল (দ্বীনের মৌলিক মূলনীতি) গ্রহণ করে থাকে। আর এসব মৌলিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে তাদের আনুগত্য ও অস্বীকৃতির (অর্থাৎ, আল-ওয়ালা ও আল-বারা) সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড।

যেসব সুবিদিত উলামারা আকিদাহর এই সুবিন্যস্ত সংকলনগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন এবং তাঁদের পূর্বে যাঁরা অতীত হয়ে গেছেন—তাঁদেরকেই সামষ্টিকভাবে ‘সালাফ’ বলা হয়। তাই পাশ্চাত্যের যেসব গবেষক সালাফি আকিদাহ ও মানহাজের এসব ক্ল্যাসিকাল (ধ্রুপদী) রচনাবলি পড়েনি বা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেনি, তাদের পক্ষে সালাফিদেরকে এই আধুনিক শ্রেণিবিভাগে বিভক্ত করা কখনোই সম্ভব নয়, যে বিভাগের কথা আমরা আজকাল অহরহ শুনে থাকি। আধুনিক যুগে সালাফিয়্যাহকে এই তিনটি ধারায় বিভক্ত করার প্রবণতা মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ‘জিহাদি’ দলগুলোর নিজস্ব দাবির ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। এসব দলগুলো নিজেদের কর্মপদ্ধতির বৈধতা ও বিশুদ্ধতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে নিজেদের সালাফিয়্যাহর সাথে ‘সম্পৃক্ত’ করে; যেন সাধারণ মুসলিমরা তাদের ‘প্রকৃত মুসলিম’ হিসেবে গণ্য করে, যেহেতু তারা (তাদের দাবিতে) সালাফদের অনুসরণ করে। বহু পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক/লেখক এই ভ্রান্ত ধারণার (Myth) ফাঁদে পা দিয়েছে। আর এর ভিত্তিতে তারা সালাফি হওয়ার প্রকৃত সংজ্ঞাকে সংকুচিত করা (Reductionism) এবং নিজেদের মতো করে তার পুনঃসংজ্ঞায়নের (Redefinition) এক অযৌক্তিক প্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে।

 
এসব অ্যাকাডেমিকদের সালাফি ধর্মতত্ত্ব তথা স্বয়ং সালাফিয়্যাহকে সংজ্ঞায়িত করে এমন প্রথম যুগের রচনাবলি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে চরম ঘাটতি রয়েছে; তারা গভীর বিশ্লেষণের পরিবর্তে সবচেয়ে সহজ পথটি বেছে নিয়েছে: অর্থাৎ, সালাফিজম মূলত তাই যা আধুনিকতাবাদী (Modernist) দলগুলো নিজেদের মতো করে সংজ্ঞায়িত করে! এরপর তারা কেবল সেসব গোষ্ঠীকে খুঁজতে শুরু করে, যাদের সাথে তাওহিদ, শিরক, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, তাকদির ইত্যাদির মতো কিছু সাধারণ ধারণায় বাহ্যিক মিল পাওয়া যায়, এবং অতঃপর তাদের সবাইকে ‘সালাফিজম’ নামক একটি একক ব্লকে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। অতঃপর এই কৃত্রিম ব্লককে আবার তিন ভাগে ভাগ করে: নিষ্ক্রিয়বাদী (Quietists), রাজনৈতিক (Politicos) ও জিহাদবাদী (Jihadists)। এরপর থেকে প্রায় প্রতিটি পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক সালাফিদের সংক্রান্ত তার লেখালেখিতে এই শ্রেণীবিভাগকেই ধ্রুব সত্য ধরে তাদেরকে এর আলোকে উপস্থাপন করেছে। আমার সহজ কথা হলো: যে সংজ্ঞায়ন বা মৌলিক ধারণার ভিত্তিই গলদে ভরা, তার ওপর দাঁড়িয়ে করা পরবর্তী পাঠ ও নীতি-সিদ্ধান্তগুলো যে অনিবার্যভাবেই ভ্রান্তিতে পর্যবসিত হবে, তা বলাই বাহুল্য।

সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহ এমন কোনো কৃত্রিম উপাধি নয়, যা কোনো দল বা গোষ্ঠী কেবল নিজেদের জন্য দাবি করলেই সিদ্ধ হয়ে যায়; কিংবা অতীতে মুসলিমদের—বিশেষ করে সালাফিদের—কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় কিছু আলিমদের নাম জপলেই (যেমন: ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব প্রমুখ) তা অর্জন করা সম্ভব। বরং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আসলেই সালাফিয়্যাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত কি না, তা পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড হলো পূর্ববর্তী উলামাদের লিখিত আকিদাহর গ্রন্থগুলোর প্রতি তাদের অনুসরণের গভীরতা ও আনুগত্যের মাত্রা।
 
এসব সুপ্রসিদ্ধ, বহুল প্রচলিত ও ইংরেজিতে অনূদিত ক্ল্যাসিকাল গ্রন্থের স্পষ্ট উদাহরণ হলো—আল-বারবাহারি (মৃ. ৩২৯হি) রচিত “The Explanation of the Creed (শারহুস সুন্নাহ)”, অথবা আহমাদ ইবনু হাম্বল (মৃ. ২৪১হি) রচিত “Foundations of Sunnah (সুন্নাহর মূলনীতি)”, অথবা “Mountains of Knowledge”, যা অন্তত বারোজন মহান পূর্ববর্তী আলিমের আকিদাহর একটি সংকলন। কেবল এসব রচনা পাঠ করলেও (অন্যান্য অগণিত রচনাবলির কথা নাহয় বাদই দিলাম) যে কেউ এই অকাট্য উপসংহারে পৌঁছাতে বাধ্য হবে, সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর পথ একটাই; তা কোনোভাবেই তিন বা ততোধিক ধারায় বিভক্ত নয়। সুতরাং, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সালাফিয়্যাহ বিচার করতে হবে এসব ও অন্যান্য কালজয়ী রচনার সুস্পষ্ট নীতিমালার আলোকে, যেগুলোই মূলত সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর স্পষ্ট নিরূপক (Definer)।

ইমাম আল-আওযাঈকে (মৃ. ১৫৭ হিজরি, রাহিমাহুল্লাহ) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আপনি কি প্রকৃত মুমিন বা পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার (True believer)?” তিনি উত্তর দিলেন: “এ প্রশ্নটি করাই একটি বিদআত (নব উদ্ভাবিত বিষয়)। আমাদের নবি (ﷺ) এমন প্রশ্ন তোলার কোনো বিধান দিয়ে যাননি। সুন্নাহর ওপর ধৈর্যধারণ করো; তোমার পূর্ববর্তীরা যেখানে থেমে গেছেন, তুমিও সেখানে থেমে যাও; তাঁরা যা বলেছেন, কেবল তাই বলো; তাঁরা যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা থেকে তুমিও বিরত থাকো; এবং তোমার নেক পূর্বসূরিদের (সালাফ) পথ অনুসরণ করো। কেননা তাঁদের জন্য যা যথেষ্ট হয়েছিল, তা তোমার জন্যও যথেষ্ট হবে। শামের (সিরিয়া অঞ্চলের) অধিবাসীরা এই বিদআতগুলোর বিষয়ে কিছুই জানতো না, যতক্ষণ না ইরাকের একদল লোক তা তাদের দিকে ছুঁড়ে দিলো। আর যদি এসবের [বিদআতের] মধ্যে বিন্দুমাত্রও কল্যাণ থাকতো, তবে পূণ্যবান/নেককার পূর্বসূরিদের (সালাফ) বাদ দিয়ে তোমরা কিছুতেই এর প্রথম ভাগীদার হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারতে না।

সালাফদের থেকে কোনো কল্যাণই গোপন বা আটকে রাখা হয়নি, আর তোমাদের বিশেষ কোনো শ্রেষ্ঠত্বের কারণেও সেই কল্যাণ তাঁদের বঞ্চিত করে তোমাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়নি; কারণ তাঁরা ছিলেন তাঁর নবি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবি—যাদের তিনি মনোনীত করেছিলেন এবং যাদের মধ্যেই তিনি তাঁকে (ﷺ) প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন:

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, আর যারা তাঁর সাথে রয়েছে তারা কাফিরদের [যারা আক্রমণ করে তাদের] বিরুদ্ধে কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সদয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবেন। [আল-ফাতহ ৪৮:২৯]
[আবু নুআইম আল-আসবাহানির ‘হিলইয়াতুল-আউলিয়া’-তে (৮/২৫৪–২৫৫) সংকলিত; দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৪০৫ হি, চতুর্থ সংস্করণ।]

আধুনিকতাবাদী তথাকথিত “জিহাদি” ও রাজনৈতিক দলগুলো যখন সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততার দাবি তোলে, তখন তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি—কারণ তারা আকিদাহ ও মানহাজের অগণিত বিষয়ে প্রথমযুগের সালাফদের কালজয়ী রচনাবলি ও সুনির্দিষ্ট উসুলের (মূলনীতি) চরম বিরোধিতা করে। দ্বীনের নামে “সংস্কার” ও “সংশোধনের” জন্য তারা এমনসব নতুন উপায় ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যা সালাফরা না কখনো ব্যবহার করেছেন, না তারা জানতেন। যেমন: রাজপথে বিক্ষোভ ও মিছিল করা, সশস্ত্র বিদ্রোহ, বিপ্লব ও অভ্যুত্থান ঘটানো, আবেগ সর্বস্ব আনাশিদ (ইসলামি সঙ্গীত), আত্মঘাতী বোমা হামলা, নিরীহ বেসামরিক মানুষকে অপহরণ ও হত্যার লক্ষ্যবস্তু বানানো, যুদ্ধবন্দীদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা, মিম্বার থেকে শাসকদের গালমন্দ করা ও তাদের বিরুদ্ধে জনগণের মাঝে উসকানি ছড়িয়ে দেওয়া, তথাকথিত ‘বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে’ বিদআতের সূচনা করা বা বিদআতের প্রতি সহনশীল হওয়া, মুসলিম শহর ও জনপদে বোমাবাজি করা, অমুসলিমদের নিজ দেশে কিংবা মুসলিম ভূখণ্ডে যারা আসে তাদের হত্যা করা, রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের হত্যা করা, মুসলিম জাতির ওপর ক্ষমতাসীন অত্যাচারী শাসকদের (ও রাজাদের) শাসন প্রত্যাখ্যান ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে প্ররোচিত করা, বৈধ কর্তৃপক্ষ বা শাসকের অনুমোদন ব্যতীত যুদ্ধ পরিচালনা করা, কেবল আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা না করার কারণে শাসকদেরকে ঢালাওভাবে কাফির ঘোষণা করা, বিদআতি নীতির ওপর ভিত্তি করে ওয়ালা ও বারা নির্ধারণ করা, তাওহিদ ও মুতাবাআহর (নবির অনুসরণ) দিকে মানুষকে দাওয়াহ দেওয়ার ক্ষেত্রে নবির সুনির্দিষ্ট দাওয়াতি মানহাজকে উপেক্ষা করা, এবং ‘শরিয়াহ অনুযায়ী বিচার করে এমন কোনো মুসলিম দেশ নেই’—তাদের এই দাবি ইত্যাদি।


সুতরাং, প্রথম যুগের আকিদাহর সেই গ্রন্থগুলোর কোথায় এসব বিদআতি কার্যক্রম ও অনাচারের অনুমোদন রয়েছে? আল-আওযাঈ যেমন বলেছেন: “আর যদি এসবের [বিদআতের] মাঝে বিন্দুমাত্রও কল্যাণ থাকতো, তবে পূণ্যবান পূর্বসূরিদের (সালাফ) বাদ দিয়ে তোমরা কিছুতেই এর প্রথম ভাগীদার হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারতে না।”

অতীতের দুই মহান আলিমের দুটি যুগান্তকারী উক্তি উদ্ধৃত করে আমি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার ইতি টানছি, যা সালাফদের সেই মানহাজকে স্পষ্ট করে, যে মানহাজ কাল ও স্থানের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না:

আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনু সাল্লাম (মৃ. ২২৪হি) বলেছেন: “সুন্নাহর অনুসারী ব্যক্তি যেন জ্বলন্ত অঙ্গার (কয়লা) আঁকড়ে ধরে রাখা কেউ—আমার কাছে তা এই জামানায় আল্লাহর পথে তলোয়ার দিয়ে জিহাদ করার চাইতে উত্তম।” [তারিখ বাগদাদ ১২/৪১০]

ইবনুল কাইয়িম (মৃ. ৭৫১হি) বলেছেন: “দলিল-প্রমাণ ও সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে জিহাদ (অর্থাৎ, আল্লাহর পথে সংগ্রাম) তলোয়ার, তির ও বর্শার অগ্রভাগ দিয়ে জিহাদের ওপর প্রাধান্য রাখে।” [দেখুন: আল-হাররাসের শারহ আন-নুনিয়্যাহ ১/১২; ইবনু তাইমিয়্যাহর আল-জাওয়াব আস-সহিহ ১/২৩৭]


তথ্যসূত্র: abukhadeejah.com
পরবর্তী পূর্ববর্তী
কোনো মন্তব্য নেই
মন্তব্য লিখুন
comment url