সালাফিদেরকে নিষ্ক্রিয়, রাজনৈতিক ও জিহাদি হিসেবে ভাগ করা: পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের একটি অগ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিন্যাস ও তার জবাব

সালাফি দাওয়াহ বাংলা
সালাফিদেরকে নিষ্ক্রিয় (Quietists), রাজনৈতিক (Politicos) ও জিহাদি (Jihadists) হিসেবে ভাগ করা: পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের একটি অগ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিন্যাস ও এর অসারতার জবাব

মাম আল-আওযাঈ (জন্ম: ৮৮ হিজরি, মৃত্যু: ১৫৭ হিজরি) থেকে একটি সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবি () যেসব কাজ করেননি সেসব থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিতেন। তিনি মনে করতেন, নবিজি যা পরিত্যাগ করেছেন তা যারা পালন করে, তারা দ্বীনে মিথ্যা বিদআতের প্রচলন করে। এটা সুন্নাহর অগণিত ইমাম ও উলামাদের অবস্থান ছিল, এবং নিঃসন্দেহে এর প্রভাব মুসলিমদের আচরণে যুগের পর যুগ ধরে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিদ্যমান আছে। কোনো সম্প্রদায়ের জন্য এটা সঠিক নয় যে তারা তাদের “ঈমান” এমনভাবে পালন করবে, যা নবি (), তাঁর সাহাবাহ এবং প্রথম তিন প্রজন্মের অনুসারীগণ পালন করেননি—অথচ দাবি করবে, “তারা না করলেই যে তা ভুল, তা তো নয়!” 

ওয়াহির প্রামাণ্য দলিল ও আকিদাহর প্রাথমিক রচনাবলি থেকে জানা যায় সালাফিয়্যাহর মৌলিক মূলনীতি হলো: যদি রাসুল উম্মাহর সংশোধনের জন্য কোনো বিশেষ পদ্ধতি, কর্মপন্থা বা উপায়ের ব্যবহার উল্লেখ না করে থাকেন, তাহলে তা সালাফিয়্যাহর দিকে আরোপিত করা যায় না, বা এর মূলনীতিসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয় না। মালিক ইবনু আনাস (মৃ. ১৭৯হি) বলেছেন: “এই উম্মাহর পরবর্তী অংশ কেবল তা দ্বারাই সংশোধিত হবে যা এর পূর্ববর্তীদের সংশোধন করেছিল।”
অনেক “অ্যাকাডেমিক”, যারা সালাফিয়্যাহ বোঝার চেষ্টা করে, তারা আমাদের সময়ে সালাফিদের তিনটি দল নিয়ে কথা বলে:

  • ১. নিষ্ক্রিয়/ধর্মপরায়ণ (Quietist/Pietist) সালাফি,
  • ২. রাজনৈতিক (Political) সালাফি এবং
  • ৩. জিহাদি (Jihadist) সালাফি।
অতঃপর তারা তাদের সালাফি মতবাদ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণার আলোকে এই তিনটি ধারাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু সালাফিরা (ধর্মতাত্ত্বিকভাবে সংজ্ঞায়িত) তিনটি দল—তাদের এই ধারণাটাই ভুল কারণ নবি () ও তাঁর সাহাবিরা ছিলেন “এক জামাআত”, অর্থাৎ ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষায় “এক দল” বা “এক সংঘ”—আর ‘জামাআহ’ শব্দটি দ্বারা এটাই বোঝানো হয়। নবি () নিজেই উল্লেখ করেছেন যে তাঁর ইন্তেকালের পরে মুসলিমদের মধ্যে অনেক দল আবির্ভূত হবে, যেমনিভাবে নবি মূসা ও ঈসার পরে যথাক্রমে অনেক সম্প্রদায় আবির্ভূত হয়েছিল। যেমন একটি সহীহ হাদীসে নবি মুহাম্মাদ () এই সম্প্রদায়গুলোর সংখ্যা তিয়াত্তর হিসাবে উল্লেখ করেছেন। সেই হাদীসে তিনি একটি দল/সম্প্রদায়কে “নাজাতপ্রাপ্ত” বলে ঘোষণা করেছেন এবং তার নাম দিয়েছেন “জামাআত”, কিংবা অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, “আজ আমি ও আমার সাহাবিগণ যে বিষয়ের ওপর আছি।” এটাই সেই এক সমষ্টি, যাদেরকে ‘সালাফ’ বলা হয়, আর যারা তাদের অনুসরণ করেছে সেই প্রাথমিক প্রজন্মগুলোও—আকিদাহ ও মানহাজের দিক থেকে যা অবিচ্ছেদ্য; তাই যারা এই সালাফদের অনুসরণ করে তারাও আকিদাহ ও মানহাজে অবিচ্ছেদ্য। ফলে যারা নিজেদের “জামাআহ” বলে দাবি করে, অথচ একইসাথে নবি () ও তাঁর সাহাবিগণ তাঁর জীবিতকালে যে বিষয়ের ওপর ছিলেন তার লঙ্ঘন ও বিরোধিতা করে—তাদের জন্য কোনো সুযোগ বাকি নেই।

পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের মধ্যে সালাফিজম (বা সালাফিয়্যাহ) বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ভুল হলো তাদের এই ধারণা, কোনো ব্যক্তি বা দল যদি বাহ্যিকভাবে “সালাফি আকিদাহ ও ধর্মতত্ত্ব” স্বীকার করে, তবে তাদের “জিহাদি ঘোষণাপত্র (ইশতেহার)”, “আধুনিকতাবাদী (Modernist) পদ্ধতি” বা “রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি” যাই হোক না কেন, তাকে সালাফি বলে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, এই ওয়েস্টার্ন অ্যাকাডেমিকদের মতে, সালাফিয়্যাহ হলো একটি নির্দিষ্ট আকিদাহ গ্রহণ করা, যা মূলত অদৃশ্য বিষয়াবলির (আল-গাইব) সাথে সম্পর্কিত—যেমন তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস ও তাঁর ইবাদাহ), আখিরাতের ঘটনাবলি, আল্লাহর অনন্য নাম ও গুণাবলি, কবরের ফিতনাহ (পরীক্ষা), মালাইকাদের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদি। সালাফিজমের মূলভাব নির্ধারণের বিষয়টি যখন আসে তখন তারা এই সংজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে যেকোনো সম্প্রদায়কে এর অন্তর্ভুক্ত করে যারা এই “সালাফি ধর্মতত্ত্ব” শেয়ার করে, আর বাকি সব পার্থক্যকে তারা বাহুল্য বা গৌণ বলে মনে করে। তাই শাসনব্যবস্থা, বিদ্রোহ, খিলাফাহ, বিদআত, জিহাদ, ওয়ালা ও বারা, তাকফির, ইকামাতুল-হুজ্জাহ ইত্যাদি বিষয়ে বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এই অ্যাকাডেমিকদের সংজ্ঞায়িত (বা ধারণাপ্রসূত) সালাফিজমের “অংশীদার মূল স্তম্ভগুলোর” ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। বাস্তবিক অর্থে, এর মানে হলো আকিদাহ ও নববি কর্মপদ্ধতির (মানহাজ) একটি বড়ো অংশ সালাফিয়্যাহর এই চাপিয়ে দেওয়া সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়ে যায়।

যখন কেউ নবি ()-এর ইন্তেকালের পর প্রথম যুগের সুন্নাহর উলামাদের প্রথম তিন থেকে পাঁচ শতাব্দীতে সংকলিত আকিদাহর গ্রন্থাবলি গবেষণা করে—যেমন আবু হাতিম, আবু যুরআহ, সাবুনি, লালিকাঈ, খাল্লাল, তাহাওয়ি, আহমাদ ইবনু হাম্বল, আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি, ইবনু আবি বকর আস-সিজিস্তানি, ইবনু বাত্তাহ, আল-বারবাহারি, বুখারি, মারওয়াযি প্রমুখের রচনাবলি, তখন তিনি স্পষ্ট ও সুনিশ্চিতভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে, সালাফদের আকিদাহ অদৃশ্য বিষয়ের গুটিকয়েক বিশ্বাস—যেমন আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, কবরের ঘটনাবলি, আখিরাত, তাকদির ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে তাঁদের আকিদাহর রচনাবলিতে শাসনব্যবস্থা, বিদ্রোহ, বিদআত, ধর্মদ্রোহ, যিনদিক ও আহলুল-বিদআতের সাথে আচরণ, নুসুস বুঝার পদ্ধতি, ওয়াহির নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে আকল-বুদ্ধির অবস্থান, অত্যাচারী শাসনব্যবস্থা ও সরকারের সাথে আচরণ, তাকফির, ওয়ালা ও বারা ইত্যাদি বিষয়াদিকেও অন্তর্ভুক্ত করতেন। নিশ্চয়ই এই ধর্মতাত্ত্বিক/আকিদাহগত/কর্মপদ্ধতিমূলক গ্রন্থাবলি সালাফিদের জন্য মৌলিক পাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়—এই রচনাবলি থেকেই আহলুস সুন্নাহ/সালাফিয়্যাহ তাদের মূল (Core) বিশ্বাস, তাদের আকিদাহ, তাদের মানহাজ, তাদের উসুল গ্রহণ করে। এসব মৌলিক বিশ্বাসগুলোকে কেন্দ্র করেই তারা আনুগত্য ও অস্বীকৃতি (অর্থাৎ, আল-ওয়ালা ও আল-বারা) প্রতিষ্ঠা করে।

যেসব শ্রদ্ধেয় উলামারা আকিদাহকে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং যারা তাঁদের পূর্ববর্তী ছিলেন—তাঁদেরকে সামষ্টিকভাবে ‘সালাফ’ বলা হয়। তাই যেসব পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক সালাফি আকিদাহ ও মানহাজের এই ক্ল্যাসিকাল রচনাবলি পড়েনি এবং অধ্যয়ন করেনি, তারা কখনোই সালাফিদের এসব দলে বিন্যাস করতে পারে না, যেগুলোর কথা আমরা এখন সাধারণত শুনে থাকি। আধুনিক যুগে সালাফিয়্যাহর এই তিনটি দলে শ্রেণীবিভাগ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ‘জিহাদি’ গোষ্ঠীর দাবির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যারা নিজেদের কর্মকাণ্ডের বিশুদ্ধতা ও বৈধতা খোঁজার জন্য সালাফিয়্যাহর সাথে ‘সম্পৃক্ত’ বলে দাবি করে এবং ফলস্বরূপ মুসলিম জনসাধারণ তাদের ‘প্রকৃত মুসলিম’ হিসেবে দেখে, কারণ তারা সালাফদের অনুসরণ করে (অথবা এমনটা তারা দাবি করে)। বহু পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক/লেখক এই ভ্রান্ত ধারণার (Myth) ফাঁদে পা দিয়েছে এবং এর ভিত্তিতে তারা সালাফি হওয়ার অর্থের পুনঃসংজ্ঞায়ন (Redefinition) ও সংকীর্ণীকরণের (Reductionism) পাল্লায় পড়েছে।


এসব অ্যাকাডেমিকদের সালাফি ধর্মতত্ত্ব তথা স্বয়ং সালাফিয়্যাহকে সংজ্ঞায়িত করে এমন প্রাচীনতম রচনাবলির গবেষণার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে; বরং তারা সবচেয়ে সহজ পন্থাটি বেছে নিয়েছে: সালাফিজম হলো তাই যা আধুনিকতাবাদী (Modernist) দলগুলো সংজ্ঞায়িত করে! এরপর তারা সেসব সম্প্রদায় খুঁজতে শুরু করলো, যারা তাওহিদ, শিরক, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, তাকদির ইত্যাদির কিছু সাধারণ ধারণা শেয়ার করে, এবং তাদের ‘সালাফিজম’ নামে পরিচিত একটি ব্লকে রাখে। অবশেষে এই ব্লককে তিন ভাগে ভাগ করলো: নিষ্ক্রিয়বাদী (Quietists), রাজনৈতিক (Politicos) ও জিহাদবাদী (Jihadists)। এরপর থেকে প্রায় প্রত্যেক পশ্চিমা অ্যাকামেডিশিয়ান সালাফিদের নিয়ে তার লেখা এই শ্রেণীবিভাগের আলোকে উপস্থাপন করেছে। আমার সহজ যুক্তি হলো: যদি এই ধারণাগুলোর ভিত্তিই ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে পরবর্তী পাঠ ও নীতি-সিদ্ধান্তগুলোও নিশ্চিতভাবে সেই একই ত্রুটি বহন করবে।

সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহ কোনো দল/গোষ্ঠীকে দেওয়া কোনো উপাধি নয়—যে দল কেবল নিজেরাই নিজেদের জন্য তা দাবি করে, কিংবা আমরা তাদের দেখি প্রায়শই অতীতের কিছু জনপ্রিয় আলিমের নাম উল্লেখ করতে, যাঁরা মুসলিমদের এবং বিশেষত সালাফিদের কাছে শ্রদ্ধেয়—যেমন ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব প্রমুখ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সালাফিয়্যাহ অবশ্যই পূর্ববর্তী উলামাদের লিখিত আকিদাহ গ্রন্থগুলোর প্রতি তাদের অনুসরণের মাত্রা দিয়ে পরিমাপ করতে হবে।

এসব বিখ্যাত, বহুল প্রচলিত ও ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থের স্পষ্ট উদাহরণ হলো আল-বারবাহারি (মৃ. ৩২৯হি) রচিত “The Explanation of the Creed (শারহুস সুন্নাহ)”, অথবা আহমাদ ইবনু হাম্বল (মৃ. ২৪১হি) রচিত “Foundations of Sunnah (সুন্নাহর মূলনীতি)”, অথবা “Mountains of Knowledge”, যা অন্তত বারোজন মহান পূর্ববর্তী আলিমের আকিদাহর সংকলন। এসব রচনা পড়লে (অন্যান্য অগণিত রচনার কথা তো বাদই দিলাম) এই উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর পথ একটাই, তা তিন বা ততোধিক ভাগে বিভক্ত নয়। এসব ও অন্যান্য রচনার ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সালাফিয়্যাহ বিচার করা উচিত যা সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর স্পষ্ট নিরূপক (Definer)।

ইমাম আল-আওযাঈ (মৃ. ১৫৭ হিজরি, রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আপনি কি প্রকৃত মুমিন (True believer)?” তিনি উত্তর দিলেন: “যে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তা একটি বিদআত। আমাদের নবি () এমন প্রশ্নের কোনো বিধান দেননি। সুন্নাহর উপর ধৈর্যধারণ করো—যেখানে তোমার পূর্ববর্তীরা থেমে গেছেন, সেখানে থেমে যাও; তাঁরা যা বলেছেন, তাই বলো; তাঁরা যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা থেকে বিরত থাকো; এবং তোমার নেক পূর্বসূরিদের (সালাফ) পথে চলো। কারণ তাঁদের জন্য যা যথেষ্ট হয়েছে, তা তোমার জন্যও যথেষ্ট হবে। শামের (সিরিয়ার) লোকেরা এই বিদআতগুলো সম্পর্কে জানতো না, যতক্ষণ না ইরাকের কিছু লোক সেগুলো তাদের দিকে ছুঁড়ে দিল। আর যদি এই [বিদআতের] মধ্যে কোনো কল্যাণ থাকতো, তবে তোমার পূর্বসূরিদের (সালাফ) বাদ দিয়ে তোমরাই প্রথম এর দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে না।”

সালাফদের কাছ থেকে কোনো কল্যাণই আটকে রাখা হয়নি, আর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকার কারণে তা তাঁদের বাদ দিয়ে তোমাদের জন্য সঞ্চিত করেও রাখা হয়নি; কারণ তাঁরা ছিলেন তাঁর নবি মুহাম্মদ ()-এর সাহাবি—যাঁদের তিনি মনোনীত করেছিলেন এবং যাদের মধ্যেই তিনি তাঁকে () প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন:

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, আর যারা তাঁর সাথে রয়েছে তারা কাফিরদের [যারা আক্রমণ করে তাদের] বিরুদ্ধে কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সদয়। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবেন। [আল-ফাতহ ৪৮:২৯]
[আবু নুআইম আল-আসবাহানীর ‘হিলইয়াতুল-আউলিয়া’-তে (৮/২৫৪–২৫৫) সংকলিত; দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৪০৫ হি, চতুর্থ সংস্করণ।]

আধুনিকতাবাদী “জিহাদি” ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যখন সালাফিয়্যাহ/সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ততার দাবি করে, তখন তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি—কারণ তারা আকিদাহ ও মানহাজের বহু বিষয়ে প্রথমযুগের সালাফদের রচনাবলির বিরোধিতা করে এবং সালাফদের উসুলের পরিপন্থী। দ্বীনের মাঝে তারা “সংস্কার” ও “সংশোধনের” এমনসব উপায় ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করে, যা সালাফরা না কখনো ব্যবহার করেছেন, না তারা জানতেন; যেমন: রাস্তায় বিক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিপ্লব, অভ্যুত্থান, আনাশিদ, আত্মঘাতী বোমা হামলা, বেসামরিক লোকদের অপহরণ ও হত্যার লক্ষ্যবস্তু বানানো, যুদ্ধবন্দীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, মিম্বার থেকে শাসকদের গালমন্দ করা এবং জনগণকে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়া, ‘বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে’ বিদআত করা ও সহ্য করা, মুসলিম শহর ও জনগোষ্ঠীতে বোমাবাজি করা, অমুসলিমদের তাদের নিজ দেশে এবং যারা মুসলিম ভূখণ্ডে আসে তাদের হত্যা করা, রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের হত্যা, মুসলিম জাতির ওপর অত্যাচারী শাসকদের (ও রাজাদের) শাসন প্রত্যাখ্যান ও বিদ্রোহ করা, শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে প্ররোচিত করা, কোনো কর্তৃপক্ষ ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনা করা, শাসকদের কাফির ঘোষণা করা কারণ তারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার করে না, বিদআতি নীতিকে কেন্দ্র করে ওয়ালা ও বারা প্রতিষ্ঠা করা, তাওহিদ ও মুতাবাআহর দিকে মানুষকে দাওয়াহ দেওয়ার ক্ষেত্রে নবিজির পদ্ধতি দিয়ে শুরু না করা, এবং শরিয়াহ অনুযায়ী বিচার করে এমন কোনো মুসলিম দেশ নেই তাদের এই দাবী ইত্যাদি।

পড়ুন: রাস্তায় মিছিল, বিক্ষোভ ও পণ্য বয়কট কি অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বৈধ উপায়? : প্রথম পর্ব

তো প্রথম যুগের আকিদাহর সেই গ্রন্থগুলোর কোথায় এসব বিদআতি কার্যক্রমের অনুমোদন আছে? যেমন আল-আওযাঈ বলেছেন: “আর যদি এই [বিদআতের] মধ্যে কোনো কল্যাণ থাকতো, তাহলে তোমার পূর্বসূরিদের (সালাফ) বাদ দিয়ে তোমরাই প্রথম এর দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে না।”

অতীতের দুই প্রখ্যাত আলিমের দুটি বক্তব্য দিয়ে আমি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করছি, যা সালাফদের সেই মানহাজ স্পষ্ট করে, যা কাল ও স্থানের সাথে পরিবর্তিত হয় না:

আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনু সাল্লাম (মৃ. ২২৪হি) বলেছেন: “সুন্নাহর অনুসারী সেই ব্যক্তির মতো, যে জ্বলন্ত অঙ্গার (কয়লা) আঁকড়ে ধরে আছে—এ যুগে আমি তা আল্লাহর পথে তলোয়ার দিয়ে জিহাদ করার চেয়ে একে উত্তম মনে করি।” [তারিখ বাগদাদ ১২/৪১০]

ইবনুল কাইয়িম (মৃ. ৭৫১হি) বলেছেন: “দলিল ও বক্তব্যের মাধ্যমে জিহাদ (অর্থাৎ, আল্লাহর পথে সংগ্রাম) তলোয়ার, তির ও বর্শার অগ্রভাগ দিয়ে জিহাদের ওপর প্রাধান্য রাখে।” [দেখুন: আল-হাররাসের শারহ আন-নুনিয়্যাহ ১/১২; ইবনু তাইমিয়্যাহর আল-জাওয়াব আস-সহিহ ১/২৩৭]


তথ্যসূত্র: abukhadeejah.com

পূর্ববর্তী পোস্ট
কোনো কমেন্ট নেই
কমেন্ট করুন
comment url