অবিশ্বাসীদের উৎসব ও বার্ষিক উদযাপনে অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গ

সালাফি দাওয়াহ বাংলা
salafidawahbangla
হোলি, ক্রিসমাস, হ্যালোইন, ইস্টার, থ্যাংক্সগিভিং, এপ্রিল ফুলস, মাদার্স ডে ও ভ্যালেন্টাইন্স ডে: অবিশ্বাসীদের উৎসব ও বার্ষিক উদযাপনে অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে ইবনু তাইমিয়্যাহ


﷽


যাবতীয় প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আল্লাহ (জাল্লা ওয়া আলা) মালাইকাদের সর্বোচ্চ আসরে আমাদের সম্মানিত নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবিগণ ও কিয়ামাত পর্যন্ত সঠিকভাবে তাঁদের অনুসরণকারী সকলকে পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত আছে, মুসলিমদের জন্য ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বার্ষিক উৎসব দেখতে যাওয়া (বা অংশগ্রহণ করা) জায়েয নয়। এবং তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) দলিল হিসেবে মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহর এই বাণী (কালাম) উল্লেখ করেছেন:

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

“আর যারা মিথ্যার সাক্ষ্য হয় না এবং যখন তারা কোনো অসার কথা-কাজের কাজের পাশ দিয়ে যায়, তখন তারা সসম্মানের সাথে পাশ কেটে চলে যায়।” [আল-ফুরকান: ৭২] ইমাম আহমাদ বলেছেন: এখানে অবিশ্বাসীদের (কুফফার) ধর্মীয় উৎসবসমূহকে বোঝানো হয়েছে; যেমন: পাম সানডে (Palm Sunday) এবং তাদের অন্যান্য বার্ষিক উৎসব।

ইমাম মালিকের (রাহিমাহুল্লাহ) সঙ্গীদের একজন, আব্দুল মালিক বিন হাবিব বলেছেন: “তাদের উৎসবের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে তোমরা তাদেরকে সাহায্য করো না, কারণ তা তাদের শিরককে সম্মান ও মহিমান্বিত করে এবং তাদের কুফরে তাদেরকে সহায়তা করে। আর শাসকের ওপর কর্তব্য হলো মুসলিমদেরকে তা থেকে নিষেধ করা, এবং এটাই মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) ও অন্যান্যদের কথা।” এ বিষয়ে (উলামাদের মাঝে) কোনো মতভেদের ব্যাপারে আমার জানা নেই। আর তাদের উৎসবে জবাইকৃত গোশত খাওয়াও এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত—এবিষয়ে ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে; বরং আমি এটিকে (অর্থাৎ, তাদের উৎসবের খাবার খাওয়াকে) আরও গুরুতর মনে করি। [দেখুন: শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহর মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৫/৩২৬]

অবিশ্বাসীদের ধর্মীয় উৎসব কিংবা কোনো বিশেষ দিবসের সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিশেষ (কিংবা নির্দিষ্ট) বিষয়ে তাদের অনুকরণ বা সাদৃশ্য অবলম্বন করা মুসলিমদের জন্য নাজায়েয। চাই তা তাদের উৎসবে ব্যবহৃত খাদ্য গ্রহণ বা প্রস্তুত করার মাধ্যমে হোক, কিংবা তাদের মতো পোশাক পরিধান করা, (উৎসব উদযাপনের নিয়তে) গোসল করা, আগুন জ্বালানো অথবা মোমবাতি প্রজ্বলন করার মাধ্যমে হোক। কোনো মুসলিমের জন্য মোটেও জায়েয নয় যে, সে তাদের এসব উৎসব উপলক্ষে নিজের স্বাভাবিক কাজকর্ম, নিত্যদিনের জীবনযাত্রা, ইবাদাতের নিয়ম কিংবা অন্যান্য অভ্যাস পরিবর্তন করবে। অমুসলিমদের উৎসবের দিনে কোনো প্রকার ভোজের আয়োজন (যেমন: পার্টি বা ওয়ালিমাহ) করা, একে অপরের সাথে উপহার-উপঢৌকন বিনিময় করা কিংবা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সহায়তামূলক কোনো পণ্য (যেমন: ক্রিসমাস ট্রি, বার্থডে বা জন্মদিনের কার্ড ইত্যাদি) বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। শিশুদের কিংবা অন্য কাউকেও অবিশ্বাসীদের উৎসবে আয়োজিত খেলাধুলায় অংশ নিতে পাঠাবেন না এবং তাদের উৎসবের দিন ভেবে নিজেদেরকেও সুশোভিত করবেন না।

সাধারণত, অমুসলিমদের বাৎসরিক উদযাপনের দিনগুলোতে তাদের ধর্মীয় বা পৌত্তলিক প্রতীকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো বিষয়কে আলাদাভাবে গ্রহণ করা মুসলিমদের জন্য নাজায়েয। বরং তাদের এসব অনুষ্ঠানের দিনগুলো একজন মুসলিমের কাছে বছরের অন্য দশটি সাধারণ দিনের মতোই গণ্য হবে যেখানে মুসলিমরা বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে কোনো ভিন্ন বা বিশেষ আমল কিংবা ভিন্ন কোনো আচরণ প্রদর্শন করে না।

আর যদি মুসলিমরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের অনুকরণ করে, তবে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের একদল উলামা (Scholars) তা অপছন্দ (ও নিষেধাজ্ঞা) প্রকাশ করেছেন। আর পূর্বে উল্লিখিত উদাহরণসমূহে তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয়ে তাদের অনুকরণের ব্যাপারে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত বা মতভেদ নেই। বরং একদল উলামা কুফরের নিদর্শন বা প্রতীককে মহিমান্বিত করে এমন বিষয়ে অবিশ্বাসীদের অনুকরণকে কুফর হিসেবে গণ্য করেছেন। [দেখুন: শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহর মাজমু আর-রাসাইল ওয়াল-মাসাইল, ১/৩/২৩৭]

বিজাতীয় যেসব উৎসব মুসলিমদের জন্য বর্জনীয়

এপ্রিল ফুলস ডে (April Fools’ Day)

একে ‘অল ফুলস’ ডে’ (All Fools’ Day) বা বোকা দিবস নামেও অভিহিত করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি এই নামে পালিত হয়। মূলত প্রায়োগিক কৌতুক (Practical jokes) বা তামাশা প্রথার ওপর ভিত্তি করে এর প্রচলন ঘটেছে—যেমন: বন্ধুদের বলা যে তাদের জুতার ফিতা খুলে গেছে কিংবা তাদেরকে অহেতুক কোনো বিভ্রান্তিকর কাজে পাঠানো (Fools’ errands)। যদিও দিনটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত রয়েছে, তবে এর সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎপত্তি অজানা এবং নিখুঁতভাবে তা নিরূপণ করা কার্যত অসম্ভব। প্রাচীন রোমে ২৫ মার্চ পালিত ‘হিলারিয়া’ (Hilaria) উৎসব এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ‘হোলি’ উৎসবের রীতিনীতির সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে, যা সাধারণত ৩১ মার্চ সমাপ্ত হয়। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

মা দিবস (Mother’s Day)

মায়েদের সম্মান প্রদর্শনের নামে পালিত দিবস, যা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। এর আধুনিক সংস্করণের উদ্ভব ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এটি পালিত হয়। বিশ্বের আরও বহু দেশই নির্দিষ্ট এই তারিখে দিনটি উদযাপন করে, আবার কেউ কেউ বছরের অন্য সময়ে এটি পালন করে থাকে। মধ্যযুগের এক প্রথা থেকে এর পটভূমি গড়ে উঠেছিল; সেসময় জীবিকার তাগিদে বা দূরে বসবাসকারী ব্যক্তিরা ‘লেন্ত’ (Lent) বা খ্রিস্টীয় উপবাসের চতুর্থ রবিবার—যা ‘লায়তারে সানডে’ (Laetare Sunday) নামে পরিচিত—সেদিন নিজেদের আদি গ্রাম, স্থানীয় চার্চ এবং নিজ নিজ মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতো। ব্রিটেনে এটি ‘মাদারিং সানডে’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং আধুনিক যুগ পর্যন্ত তা নানা রীতিনীতিতে চলমান। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

হ্যালোইন (Halloween)

‘অল হ্যালোস’ ইভ’ (All Hallows' Eve)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ৩১শে অক্টোবর রাতে পালিত এই উৎসবটি মূলত ‘অল সেইন্টস ডে’ (বা ‘অল হ্যালোস’) ডে’-এর পূর্বসন্ধ্যা। পশ্চিমা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে এই উদযাপনের মাধ্যমেই ‘অলহ্যালোউটাইড’ (Allhallowtide) মৌসুমের সূচনা ঘটে, যা টানা তিনদিন স্থায়ী হয়ে ‘অল সোলস ডে’-তে (All Souls’ Day) গিয়ে সমাপ্ত হয়। প্রাচীন ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের পৌত্তলিক কেল্টীয় (Celtic) গোত্রগুলোর ‘সামহেইন’ (Samhain) নামক বিশেষ উৎসব থেকে মূলত হ্যালোইনের উৎপত্তি। সমসাময়িক ক্যালেন্ডারে ১লা নভেম্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট দিনটিতে নববর্ষ শুরু হয় বলে বিশ্বাস করা হতো। এই দিনটি শীতকালের আনুষ্ঠানিক আগমন হিসেবে বিবেচিত হতো, যে তারিখে চারণভূমি থেকে গৃহপালিত পশু ফিরিয়ে আনা হতো এবং ভূমির মালিকানার চুক্তি নবায়ন করা হতো। সামহেইন উৎসবের সময় মৃত আত্মারা পুনর্জীবিত হয়ে নিজ নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে আসে বলে বিশ্বাস করা হতো, এবং বিশ্বাস করা হতো, বিগত এক বছরে যারা মৃত্যুবরণ করেছে, তারা পরলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। অশুভ আত্মাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তীব্র শীতের দিনগুলোতে নিজেদের চুলার আগুন নতুন করে জ্বালাতে তারা পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল অগ্নিকুণ্ড (Bonfire) প্রজ্বলিত করতো। উপরন্তু, উপস্থিত বলে বিশ্বাস করা ঘুরে বেড়ানো ক্ষতিকর ভূত বা আত্মা (Evil spirits) যেন তাদের চিনতে না পারে—সেজন্য তারা বিভিন্ন মুখোশ ও ছদ্মবেশ ধারণ করতো। এভাবেই কালক্রমে বিভিন্ন ডাইনি (Witches), ভূত-প্রেত (Hobgoblins), পরি (Fairies) ও দানবদেরকে (Demons) এই দিনটির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। এই সময়কালকে বিবাহ, স্বাস্থ্য ও মৃত্যুর মতো বিষয়ে ভবিষ্যৎ-কথন বা গণনার (Divination) জন্যও অনুকূল মনে করা হতো। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

ইস্টার (Easter)

‘ইস্টার’ (ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায় Pascha) মূলত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব, যা যিশু খ্রিস্টকে (ঈসা আলাইহিস সালাম) ক্রুশবিদ্ধ করার পর তৃতীয় দিনে তাঁর পুনরুত্থানকে (Resurrection) কেন্দ্র করে উদযাপিত হয়। ইস্টার উদযাপনের সর্বপ্রাচীন লিখিত নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে; যদিও যিশুর পুনরুত্থানের স্মারক পালন সম্ভবত তার কিছু পূর্বে শুরু হয়। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

ভ্যালেন্টাইন্স ডে (Valentines Day বা ‘ভালোবাসা দিবস’)

‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’—যাকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ নামেও অভিহিত করা হয়—প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত এমন একটি দিবস, যেদিন প্রেমিক-প্রেমিকারা শুভেচ্ছা ও নানান উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের আবেগ-অনুরাগ প্রকাশ করে থাকে। দিবসটির উৎস নিহিত রয়েছে প্রাচীন রোমানদের উৎসব ‘লুপারক্যালিয়ায়’ (Lupercalia), যা প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে উদযাপিত হতো। বসন্তের আগমনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসবে বিভিন্ন উর্বরতা-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হতো এবং লটারির মাধ্যমে নারীদের সাথে পুরুষদের জোড়া মেলানোর প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে পঞ্চম শতাব্দীর শেষে পোপ প্রথম গেলাসিয়াস ‘লুপারক্যালিয়া’ প্রথা বাতিল করে এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ চালু করেন। অতঃপর চতুর্দশ শতাব্দী থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রোমান্স ও ভালোবাসার দিন হিসেবে রূপ লাভ করে। যদিও খ্রিস্টীয় ইতিহাসে ‘ভ্যালেন্টাইন’ নামে একাধিক শহিদের নাম পাওয়া যায়, তবে ধারণা করা হয় এই দিনটির নামকরণ করা হয়েছে এমন একজন প্রাচীন খ্রিস্টান পুরোহিতের নামানুসারে, যাকে আনুমানিক ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস গথিকাসের আদেশে হত্যা করা হয়েছিল। লোকমুখে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, সেই পুরোহিত কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় কারারক্ষীর কন্যার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তার উদ্দেশে লেখা একটি চিঠির নিচে স্বাক্ষর করেন—“তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে”। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

ক্রিসমাস (Christmas)

এই আর্টিকেলটি পড়ুন: The Pagan Roots of Christmas — How Muslims treat Christmas?

নবিজির জন্মদিন এবং সাধারণ জন্মদিন

থ্যাংকসগিভিং ডে (Thanksgiving Day বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দিবস)

‘থ্যাংকসগিভিং ডে’ হলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রচলিত একটি বার্ষিক জাতীয় দিবস, যা মূলত বার্ষিক ফসল আহরণ এবং বিগত বছরের নানা বৈষয়িক প্রাচুর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদযাপন হিসেবে পালিত হয়।

সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে এ ধারণা প্রচলিত যে, তাদের এই থ্যাংকসগিভিং উৎসবটি ১৬২১ খ্রিস্টাব্দের এক ঐতিহাসিক ফসল-ভোজের অনুকরণে তৈরি। তৎকালীন প্লিমাথ (Plymouth)-এর ইংরেজ উপনিবেশবাদী প্রবর্তক (‘পিলগ্রিম’) এবং আমেরিকার আদিবাসী ‘ওয়াম্পানোয়াগ’ (Wampanoag) জনগোষ্ঠীর যৌথ অংশগ্রহণে সেই নৈশভোজটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকান সংস্কৃতিতে দিবসটি নানা পৌরাণিক গল্পগাথা ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীকতায় (Symbolism) কানায় কানায় পূর্ণ। এ দিবসের ঐতিহ্যবাহী ভোজের খাবারের তালিকায় সাধারণত টার্কি মুরগি, বিশেষ রুটির পুর বা স্টাফিং, আলু, ক্র্যানবেরি এবং কুমড়ার তৈরি বিশেষ ‘পাম্পকিন পাই’ অন্তর্ভুক্ত থাকে। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

হোলি উৎসব (Holi in Hinduism)

উত্তর ভারতজুড়ে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার দিনে (সাধারণত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে) উদযাপিত হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি প্রধান বসন্ত উৎসব। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের গায়ে রঙিন পানি ও আবির বা রঙের গুঁড়ো নিক্ষেপ করে উল্লাস প্রকাশ করে থাকে। উৎসবটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, কেবল এই দিনটির জন্য সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ, লিঙ্গভেদ, সামাজিক মর্যাদা এবং বয়সের স্বাভাবিক শিষ্টাচার ও ক্রমবিন্যাসের নিয়মগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত বা উল্টে দেওয়ার অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে রাস্তাঘাটে উদযাপনের নামে প্রায়শই চরম অশ্লীল ভাষা ও অশালীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে উৎসবের শেষ পর্যায়ে এসে যখন অংশগ্রহণকারীরা স্নান সেরে পরিষ্কার সাদা পোশাক পরিধান করে এবং বন্ধু, শিক্ষক ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়, তখন সমাজের পূর্বের সুশৃঙ্খল রীতিনীতি ও সামাজিক স্তরবিন্যাস পুনরায় বহাল ও নবায়িত হয়। হোলি বিশেষভাবে ভগবান কৃষ্ণের উপাসকদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। এর প্রধান আনন্দদায়ক আচার-অনুষ্ঠান ও লীলাখেলাকে কৃষ্ণের সাথে তাঁর অনুসারী গোপিনীদের (গোপালদের স্ত্রী ও কন্যা) লীলাখেলার অনুকরণ বলেই মনে করা হয়। [সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা]

অবিশ্বাসীদের উৎসব-উদযাপনের অনুকরণ

ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রথা, কৃষ্টি-কালচার ও উৎসবে অংশগ্রহণ কিংবা সেগুলোর অন্ধ অনুকরণ নিষিদ্ধ করেছে। এ প্রসঙ্গে সাহাবি আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন মাদিনায় হিজরত করলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে সেখানকার মানুষ প্রতি বছর নির্দিষ্ট দুটি দিন উৎসব হিসেবে পালন করছে। কতিপয় উলামা উল্লেখ করেছেন, এই দিনগুলো ছিল পারসিকদের দিবস। তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, “দিন দুটো কীসের?” তারা জানায়, এগুলো ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বের (অর্থাৎ, জাহিলিয়্যাহ যুগের) উৎসব উদযাপনের দিন। তখন তিনি বললেন:

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এই দুটি দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন; তা হলো—ঈদুল আযহা এবং ঈদুল ফিতর।” [সুনান আবি দাউদ, হাদিস: ১১৩৪] আদহা বা আযহার দিন হলো বার্ষিক হজ পালনের পর উদযাপিত কোরবানির ঈদ এবং ফিতরের দিন হলো রমজান (রামাদান) মাসের সিয়াম সাধনার পর উদযাপিত ঈদুল ফিতরের দিন। ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে ধার করা কোনো নতুন রীতিনীতি বা উদ্ভাবিত প্রথার অনুমোদন দেয় না। কারণ, অন্য ধর্মগুলো হয় মানুষের নিজের হাতে রচিত বা মানবরচিত, কিংবা পূর্ববর্তী নবিদের মূল দাওয়াহর বিকৃতি—যেমনটি খ্রিস্টধর্ম এবং তাদের প্রবর্তিত ‘ক্রিসমাস’ (বড়দিন) উদযাপনের বেলায় সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ।

সুতরাং, কোনো অমুসলিম সমাজে একীভূত বা মানিয়ে নেওয়ার অর্থ কখনোই এটি হতে পারে না যে একজন মুসলিম রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুস্পষ্ট বিধি-নিষেধ ও সুন্নাহর বিপরীতে গিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি লালন করবে। কোনো মুসলিমের এসব বিষয়ে অমুসলিমদের সাদৃশ্য ও অনুকরণ করতে সচেষ্ট হওয়া মূলত তার নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়ের (Religious identity) ওপর পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী না হওয়ার বহিঃপ্রকাশ। বরং সে বিজাতীয়দের (বিধর্মীদের) আনুকূল্য বা সুনজর, গ্রহণযোগ্যতা ও অনুমোদন অর্জনের মোহে পড়েই এসব রীতিনীতি অনুসরণে লিপ্ত হয়। নবি (ﷺ) বলেছেন:

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য ও অনুকরণ অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।” [সুনান আবি দাউদ, হাদিস: ৪০৩১] কোনো ব্যক্তি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রীতিনীতিতে যে সম্প্রদায়ের যত বেশি অনুকরণ করবে, সে ততটাই তাদের একজন বলে গণ্য হবে। নবি (ﷺ) মুসলিমদের জানিয়েছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পথ অনুসরণ করবে, এক বিঘত এক বিঘত করে, এক হাত এক হাত করে; এমনকি যদি তাদের কেউ টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করে, তোমরাও তাই করবে।” তাঁরা নবিকে (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উদ্দেশ্য করছেন?” তিনি (ﷺ) প্রত্যুত্তরে বললেন: “আর কারা?” [বুখারি ও মুসলিম]

একজন মুসলিমের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য হলো অমুসলিমদের উপাসনালয় এবং তাদের ধর্মীয় সমাবেশ বা উপাসনার স্থানগুলোতে সমবেত হওয়া ও যাতায়াত করা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা। নবি (ﷺ)-এর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: “যে ব্যক্তি অমুসলিমদের দেশে বসবাস করে, অতঃপর তাদের (পারসিকদের) নায়রুজ ও মাহরাজান উৎসব উদযাপন করে এবং তাদের অনুকরণ করতে করতে সেই অবস্হায় মৃত্যুবরণ করে, কিয়ামাতের দিন তাকে তাদের সাথেই একত্র করা হবে।” [আল-বাইহাকির সুনান আল-কুবরা, ৯/২৩৪; ইবনু তাইমিয়্যাহ ইকতিদা আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম, ১/৪৫৭-এ বলেছেন এর সনদ বা বর্ণনাসূত্র সহিহ]

একইভাবে, সাহাবি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন: “তোমরা উৎসবের দিনগুলোতে মুশরিকদের উপাসনালয় বা গির্জাগুলোতে যেয়ো না, কারণ, ঐ সময়েই তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ নেমে আসে।” [সুনান আল-কুবরা, ৯/২৩৪; আব্দুর রাযযাকের আল-মুসান্নাফ, নং ১৬০৯; ইবনু তাইমিয়্যাহ ইকতিদা আস-সিরাত আল-মুস্তাকিম, ১/৪৫৫-এ বলেছেন এর বর্ণনাসূত্র সহিহ]

ইবনু তাইমিয়্যাহ এই বিষয়ে কয়েকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর বলেন: “তাহলে তাদের উৎসবে তাদের আচার/কর্মকাণ্ডের কারণে যদি তাদের ওপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়, তবে যে ব্যক্তি তাদের সেই আচার-অনুষ্ঠানে বা কোনো কোনো কর্মে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করে, সে কি তাদের সমপরিমাণ বা তদ্রূপ শাস্তির উপযুক্ত হবে না?” [আল-ইকতিদা: ১/৪৫৮] তিনি এর ব্যাখ্যায় আরও যোগ করেন যে, এসব নুসুস (Texts) প্রমাণ করে—অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে মানুষের অংশগ্রহণ যতো বেশি হবে, সে ততো বেশি আল্লাহর ক্রোধের সম্মুখীন হবে।

আর যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সকল সৃষ্টির প্রতিপালক।


তথ্যসূত্র: abukhadeejah.com
পূর্ববর্তী
কোনো মন্তব্য নেই
মন্তব্য লিখুন
comment url