মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহ দেওয়া ফিতনাহর দিকে আহ্বানকারীদের থেকে সতর্ক থাকা ওয়াজিব - শাইখ সালিহ আল-ফাওযান
﷽
ই
মাম মুসলিম আরফাজাহ আল-আশজায়ির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাদিসে মারফু বর্ণনায় বর্ণনা করেছেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ، يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ، وَيُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ، فَاقْتُلُوهُ
যে ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসে অথচ তোমাদের বিষয় এক ব্যক্তির অধীনে ঐক্যবদ্ধ, সে তোমাদের ঐক্য ভাঙতে ও তোমাদের জামাআহকে বিভক্ত করতে চায়, তবে তাকে হত্যা করো। [নং ৬০ ও ১৮৫২]আল-আল্লামাহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) ব্যাখ্যা করেছেন:
আরফাজাহ আল-আশজায়ির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদিসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ বাণী—‘যে ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসে অথচ তোমাদের বিষয় এক ব্যক্তির অধীনে ঐক্যবদ্ধ, সে তোমাদের ঐক্য ভাঙতে ও তোমাদের জামাতকে বিভক্ত করতে চায়, তবে তাকে হত্যা করো’—এটি ইঙ্গিত করে যে, যখন কোনো সমাজের নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থায় স্থিরাবস্থা তৈরি হয়, শাসকের কাছে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) সম্পন্ন হয় এবং মানুষ সেই বায়আতের ওপর ঐক্যবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন যে ব্যক্তি মুসলিমদের ঐক্য ভাঙতে ও জামাআহকে বিভক্ত করতে উদ্যত হয়, তখন তার চরম অনিষ্ট ও ফিতনাহ থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করার জন্য তাকে হত্যা করতে হবে। এটি ক্ষুদ্রতর অনিষ্ট দ্বারা বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধের নীতির অন্তর্ভুক্ত। তাই সে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করা হবে; কারণ তাকে হত্যা করার ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা) তার কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর ক্ষতির তুলনায় কম।এটাই প্রমাণ করে, পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারীদের আনুগত্য করা জায়েয নয়; যারা ক্ষমতাসীনদের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করে সেগুলো ফিতনাহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেয়। তাই এ শ্রেণির লোকদের থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে; কারণ তাদের অনিষ্ট প্রতিরোধের মাধ্যমেই সকলের কল্যাণ নিশ্চিত হয়; তা কেবল শাসকের একক স্বার্থে নয়।হতে পারে এই পথভ্রষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার বা রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের শক্তি বা সামর্থ্য রাখে না; তবুও তারা বিভেদ সৃষ্টি করে, বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয় এবং সভা-সমাবেশ ও প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্ররোচণামূলক কথাবার্তা বলে বেড়ায়। এসবের পরিণাম শুধুই বৃহত্তর ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা) ও ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করে।আল-হাজ্জাজ (বিন ইউসুফ) নিশ্চিতভাবেই একজন জালিম ছিল এবং তার অত্যাচারে সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। তা সত্ত্বেও সে যুগের মুসলিম ও উলামারা তার এই চরম অত্যাচারের মুখেও সবর বা ধৈর্যধারণ করেছিলেন, যাদের মধ্যে তাবিয়িনদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।এটা (তার যুগে) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহ.)-এরও মূল অবস্থান ছিল; যদিও তিনি তৎকালীন শাসকদের হাতে অকথ্য কষ্ট ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ধৈর্যধারণ করেছিলেন, একমাত্র আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান কামনা করেছিলেন এবং যে শাসক তাঁকে শাস্তি দিয়েছিল ও অত্যাচার করেছিল, তাকে ক্ষমা ও মার্জনা করে দিয়েছিলেন।শাসকেরা ভুল-ত্রুটিতে লিপ্ত হলেও মুসলিমসমাজ ও উলামারা তাদের পাশে দাঁড়াতেন; তারা তাদের সহযোগিতা করতেন এবং তাদের সঙ্গে [তাদের জিহাদ/যুদ্ধে] লড়াই করতেন।বিশেষভাবে ইমাম আহমাদের বেলায় এমনটিই ঘটেছিল। মানুষের মনে খলিফার বিরুদ্ধে উত্তেজনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করার পূর্ণ সামর্থ্য তাঁর ছিল, কিন্তু তিনি ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি। এটি মুসলিমদের কর্মপদ্ধতির (মানহাজ) একটি মহান মূলনীতি: কেউ কেবল শাসকের অত্যাচার, জুলুম বা পাপাচারের কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে না; কারণ এ ধরনের বিদ্রোহের পরিণতিতে মারাত্মক ফিতনাহ, রক্তপাত এবং মানুষের মাঝে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আর তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফলে যে সুদূরপ্রসারী ফাসাদ ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়, তা তার ক্ষমতায় বহাল থাকা থেকে সৃষ্ট ফাসাদের চেয়ে বৃহত্তর। অতএব, ফিতনাহর দিকে আহ্বানকারীদের থেকে সতর্ক থাকা ওয়াজিব—যারা মুসলিমদের সারিবদ্ধ ঐক্যের মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে।
[শারহু কিতাব আল-কাবাইর; সিলসিলাহ শারহ আর-রাসাইলের ৫৫২-৫৫৩ পৃ.]
তথ্যসূত্র: abukhadeejah.com
