শাইখ সালিহ আলুশ-শাইখ: গুনাহগারদের তাকফির করার ক্ষেত্রে সাইয়িদ কুতুবের গুলু (চরমপন্থা)
সাইয়িদ কুতুবের গুলু (চরমপন্থা) প্রসঙ্গে শাইখ সালিহ আলুশ-শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ)
শাইখ সালিহ আলুশ-শাইখ সাইয়িদ কুতুবের চরমপন্থা নিয়ে মন্তব্য করেছেন, সে “আনুগত্য”-এর প্রসঙ্গকে ব্যবহার করে গুনাহগারদের তাকফির করতো এবং তা নিরঙ্কুশভাবে (Absolutely) প্রয়োগ করতো:
এসব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হলো—মুশরিকদের আনুগত্য করার বিধান সংক্রান্ত মাসআলায় আহলুল ইলমদের দেওয়া তাফসিল (বিস্তারিত ব্যাখ্যা) সে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে তার বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ দ্বারা যা প্রকাশ পায়, তা আনুগত্যের (তাআহ) ক্ষেত্রে কিছু গুলাত (চরমপন্থি) দলের সাথে মিলে যায়—যা মূলত মুশরিকদের আনুগত্য বা পাদ্রি ও রাবাইদের (অর্থাৎ, আলিমদের) আনুগত্যের পর্যায়ে পড়ে।
এর উদাহরণগুলোর একটি হলো, সূরা আল-আনআমের আয়াতের ব্যাখ্যায় তার উপস্থাপিত বক্তব্য; যে আয়াতে আল্লাহ বলেছেন—‘আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তবে নিশ্চয়ই তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে’—এ আয়াতকে কেন্দ্র করে সে দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করেছে।
আর এর মাঝেই ফ্যাশন নারী ও মডেলদের পোশাকের বিষয়টি রয়েছে, যা মূলত প্যারিসের ফ্যাশন এজেন্সিগুলো ডিজাইন করে—তার (অর্থাৎ, কুতুবের) ভাষায়। সে উল্লেখ করেছে, যারা নারীদের জন্য পোশাকের নিয়ম তৈরি করে বা তাদের পোশাকের আইন প্রণয়ন বা বিধান (Legislate) দেয়, যেমন সকালে অমুক ধাঁচের পোশাক পরতে হবে, সন্ধ্যায় এধরনের পোশাক, রাতে ঐধরনের, আর কর্মক্ষেত্রে আরেক ধরনের ইত্যাদি... সাইয়িদ কুতুবের মতে, এই দল, অর্থাৎ ফ্যাশন ডিজাইনাররা মূলত উপাস্য (আলিহা, ইলাহ-এর বহুবচন), কারণ তারা হারামকে হালাল করেছে এবং মানুষ তাদের আনুগত্য করছে, আবার হালালকে হারাম করেছে এবং এতেও তাদের আনুগত্য করা হচ্ছে। ফলে সে (কুতুব) দাবি করে বসে, যে মুসলিম নারী এই পোশাকের ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করে, সে মূলত ঐ ডিজাইনারদেরই উপাস্য (আলিহা) হিসেবে গ্রহণ করেছে; কারণ সে হারামকে হালাল করা এবং হালালকে হারাম করার ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করেছে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই, কুতুবের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ বাতিল (মিথ্যা)। কারণ ফ্যাশন ডিজাইনারদের প্রস্তাবিত কোনো শরিয়াহবিরোধী হারাম পোশাক যখন কোনো নারী পরিধান করে, তখন তা একইসাথে এটা বোঝায় না যে, সে ঐ হারাম পোশাকটি পরিধান করা নিজের জন্য শরিয়াহসম্মত বা হালাল বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। কারণ তাকফিরের বিষয় ঐ বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট, যে বিষয়কে আল্লাহ, জাল্লা ওয়া আলা (The Majestic and Exalted), হারাম করেছেন, তা আসলে হালাল… উদাহরণস্বরূপ, কোনো নারী যদি ফ্যাশন ডিজাইনারদের অনুকরণে এমন পোশাক পরিধান করে যা গায়রে মাহরামদের (পরপুরুষ) সামনে তার বক্ষদেশ ও তার পায়ের অংশ অনাবৃত করে ফেলে, এবং এর পাশাপাশি সে যদি বিশ্বাস করে যে এ কাজটি হারাম, কিন্তু কেবল প্রবৃত্তির তাড়নায় বা দুর্বল ঈমানের কারণে সে এতে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তার এমন আচরণ মোটেও কুফর নয় এবং এর দ্বারা সে তাদের ইবাদাত করেছে বলেও গণ্য হবে না। অথচ সে (কুতুব) নিছক আনুগত্যকেই (Obedience) সরাসরি কুফর বানিয়ে ছেড়েছে। আর তার এই ভ্রান্ত ভাষ্যকে কিছু চরমপন্থি জামাআত মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে, যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা ফয়সালা করা সংক্রান্ত মাসআলায় মারাত্মক বাড়াবাড়ি (গুলু) করেছে, বিশেষ করে ফ্যাশন ডিজাইনার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের এই আনুগত্যের মাসআলায় তারা কুতুবের দেওয়া এই ভ্রান্ত নীতিকেই অন্ধভাবে ধারণ করেছে…
[তথ্যসূত্র: ক্যাসেট: শারহ কিতাব মাসাইলুল জাহিলিয়্যাহ, ২য় ক্যাসেট, ২য় পাশ, এবং ইসাম বিন সিনানির বারাআহ উলামাইল উম্মাহতেও তা আছে, যা সাইয়িদ কুতুবের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে উলামাদের ভাষ্যের সংকলন]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ‘কিতাবুল ঈমান’-এ (পৃ. ৭০) আনুগত্যের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন:
وهؤلاء الذين اتخذوا أحبارهم ورهبانهم أربابا - حيث أطاعوهم في تحليل ما حرم الله وتحريم ما أحل الله يكونون على وجهين : ( أحدهما ) : أن يعلموا أنهم بدلوا دين الله فيتبعونهم على التبديل فيعتقدون تحليل ما حرم الله وتحريم ما أحل الله اتباعا لرؤسائهم مع علمهم أنهم خالفوا دين الرسل فهذا كفر وقد جعله الله ورسوله شركا - وإن لم يكونوا يصلون لهم ويسجدون لهم - فكان من اتبع غيره في خلاف الدين مع علمه أنه خلاف الدين واعتقد ما قاله ذلك دون ما قاله الله ورسوله ; مشركا مثل هؤلاء . و ( الثاني ) : أن يكون اعتقادهم وإيمانهم بتحريم الحلال وتحليل الحرام ثابتا لكنهم أطاعوهم في معصية الله كما يفعل المسلم ما يفعله من المعاصي التي يعتقد أنها معاص ; فهؤلاء لهم حكم أمثالهم من أهل الذنوب
আর যারা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করা এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করার ক্ষেত্রে তাদের পাদ্রি ও রাবাইদেরকে (ইহুদি ধর্মযাজক) অন্ধ আনুগত্য করার মাধ্যমে রব (Lord) হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা মূলত দুই প্রকার:এটা সাইয়িদ কুতুবের অনুসারী, সহযোগী ও সমর্থকদের বহুল ব্যবহৃত সেসব সংশয়গুলোর (শুবুহাত) একটি, যা তারা শারিয়াহর মূলনীতির বাইরে গিয়ে ঢালাওভাবে তাকফির (কাফির ঘোষণা) করার কাজে অপব্যবহার করে থাকে।
- প্রথম প্রকার: তারা স্পষ্টভাবে জানে, তারা (পাদ্রি ও রাবাইরা) আল্লাহর দ্বীনকে তাবদিল (বাদ্দালু/পরিবর্তন/বদলে দিয়েছে) করে ফেলেছে। তা সত্ত্বেও তারা নেতাদের অনুসরণে অন্তর থেকে এটাই বিশ্বাস ও স্বীকার (ইয়াতাকিদুনা) করে নেয় যে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আসলে হালাল, আর আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা আসলে হারাম। নবি-রাসুলদের আদেশের চরম বিরোধিতা জেনেও তারা এই বিকৃত বিশ্বাসকে লালন করে। তাহলে এটা কুফর (অবিশ্বাস)। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল একে শিরক হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তাই তারা এই তাবদিলে তাদের এই বিশ্বাসে (ইয়াতাকিদুনা) অনুসরণ করে যে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম, এতে তারা তাদের নেতাদের অনুসরণ করে, পাশাপাশি এই ইলম (জ্ঞান) থাকা সত্ত্বেও যে তারা রাসুলদের দ্বীনের বিরোধিতা করেছে, তাহলে এটা কুফর (অবিশ্বাস)। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল একে শিরক হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন—যদিও সেই অনুসারীরা ঐ পাদ্রি বা নেতাদের উদ্দেশ্যে সরাসরি সালাত (নামাজ) পড়ে না কিংবা তাদেরকে সিজদাহ করে না। অতএব, যে ব্যক্তি দ্বীনের বিরোধী কোনো বিষয়ে অন্য কারো অনুসরণ করে—এই ইলম থাকা সত্ত্বেও যে তা দ্বীনের প্রকাশ্য বিরোধী—এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অকাট্য বাণীর বিপরীতে ঐ নেতার বিকৃত মতামতকেই সত্য বলে বিশ্বাস (ইতাকাদা) করে, তবে সে ব্যক্তিও ঐ নেতাদের ন্যায় স্পষ্ট মুশরিক বলে গণ্য হবে।
- দ্বিতীয় প্রকার: তাদের ইতিকাদ ও ঈমান এই মৌলিক সত্যের ওপরই সুদৃঢ় থাকে যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম। কিন্তু তারা আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের (পাদ্রি ও রাবাইদের) অনুসরণ করে, যেমন একজন সাধারণ মুসলিম গুনাহর কাজে লিপ্ত হয়েও অন্তরে নিজেকে অপরাধী ও গুনাহগার বলে বিশ্বাস করে; তাহলে এদের বিধান তাদের মতোই, যেমন কোনো গুনাহগারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
তথ্যসূত্র: themadkhalis.com





