সাহাবিদের অবমাননা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও আল-কুরআন অবমাননার অপচেষ্টা

সালাফি দাওয়াহ বাংলা

﷽


আল্লাহর রাসুলের (ﷺ) সাহাবিদের যারা নিন্দা ও চরিত্রহনন করে, তারা অত্যন্ত কুৎসিত অভিপ্রায় ও জঘন্য মানসিকতার অধিকারী হিসেবে গণ্য। কেননা সাহাবিদের প্রতি এই বিষোদ্গার মূলত পরোক্ষভাবে আল্লাহর রাসুলকে (ﷺ) অবমাননা করা, তাঁর মহীয়ান চরিত্র ও সততাকে হেয় প্রতিপন্ন করার নামান্তর; অনুরূপভাবে আল-কুরআনের বিশ্বস্ততাকে কলঙ্কিত করা এবং সমগ্র ইসলাম ও এর অনুসারীদের চূড়ান্ত ধ্বংস কামনা করারই এক প্রচ্ছন্ন চক্রান্ত। প্রাক-যুগের পুণ্যবান (নেককার) সালাফদের আকিদাহ বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে সাহাবিদের সমালোচকদের প্রকৃত রূপ এভাবেই স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম আন-নাসাঈকে (রাহিমাহুল্লাহ) যখন মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি উত্তর দেন: [১]

“ইসলাম একটি সুদৃঢ় গৃহের ন্যায়, যার একটিমাত্র দরজা রয়েছে। আর ইসলামের দরজা হলেন সাহাবাবৃন্দ। সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবিদের প্রতি বিষোদ্গার বা গালিগালাজ করে, সে মূলত ইসলামেরই ক্ষতিসাধন ও চরম অবমাননা করতে চায়—ঠিক যেমন কোনো ব্যক্তি ঘরের দরজা ভেঙে ফেলে ভেতরে প্রবেশ করতে চায়। তদ্রূপ, যে ব্যক্তি মুআবিয়াকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অবমাননা করতে উদ্যত হয়, তার আসল উদ্দেশ্য হলো প্রকারান্তরে সমগ্র সাহাবাবৃন্দকেই অবমাননা ও কলঙ্কিত করা।” [আরবি]


আবদুল্লাহ বিন মুসআব বলেন: [২]

মাহদি জিজ্ঞেস করলেন, “যে ব্যক্তি সাহাবিদের গালি দেয়, তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?” আমি উত্তরে বললাম, “তারা মূলত যিন্দিক (যানাদিকাহ—ছদ্মবেশী ধর্মদ্রোহী ও মুনাফিক)। কেননা তারা প্রকাশ্যে সরাসরি আল্লাহর রাসুলের (ﷺ) অবমাননা করতে পারেনি; ফলে তারা তাঁর সাহাবিদের গালি দিতে শুরু করেছে। তাদের এই অপপ্রচারের সারমর্ম যেন এটাই দাঁড়ায়—‘তিনি কোনো অসৎ লোকদলের সঙ্গী ছিলেন।’ [আরবি]


শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকিদাহ বর্ণনা করতে গিয়ে সাহাবাদের মাঝে সংঘটিত বিষয়গুলো সম্পর্কে বলেছেন: [৩]

“তাঁরা (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ) সাহাবিদের মাঝে ঘটা ঘটনাগুলো নিয়ে কুৎসা বা বিতর্ক ছড়ানো থেকে নিজেদের জবানকে সম্পূর্ণ সংযত রাখেন। তাঁরা বলেন: সাহাবিদের ভুলত্রুটি ও ত্রুটিবিচ্যুতির বর্ণনায় যেসব রিওয়ায়াহ পাওয়া যায়, তার একটি বড় অংশই একেবারে মিথ্যা ও বানোয়াট; আর কিছু অতিরিক্ত সংযোজন বা বিয়োজন কিংবা মূল প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করে বিকৃত করা হয়েছে। অন্যদিকে, এসব বর্ণনার মধ্যে যা কিছু সহিহ, সেগুলোর বিষয়ে তাঁরা ক্ষমাপ্রাপ্ত (মাযুর/ওজরপ্রাপ্ত)। তারা কেবল শরিয়াহর আলোকে ইজতিহাদ (কুরআন ও সুন্নাহর গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ) করেছিলেন—যার ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, কিংবা তাঁদের ইজতিহাদি সিদ্ধান্তে ভুল করেছিলেন।” [আরবি]


ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) সাহাবিদের অবমাননাকারীদের ব্যাপারে বলেছেন: [৪]

“নিশ্চয়ই, তারা এমন এক দূরভিসন্ধিপরায়ণ দল, যারা মূলত নবিজির (ﷺ) অবমাননা করতে চেয়েছিল; কিন্তু তা তারা প্রকাশ্যে করতে সক্ষম হয়নি। ফলে তারা তাঁর সাহাবিদের অবমাননা করতে শুরু করেছে—যাতে করে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এটি বলার সুযোগ পায় যে, ‘অমুক তো একজন মন্দ লোক; সে যদি আসলেই সৎ ও ভালো মানুষ হতো, তবে তার সঙ্গীরাও নিশ্চয়ই সৎ ও ভালো হতো।’ [আরবি]


আবু যুরআহ আর-রাযি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: [৫]

“যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুলের (ﷺ) কোনো সাহাবিকে হেয় প্রতিপন্ন করতে বা তাঁদের সম্মানহানি করতে দেখবে, জেনে নিও যে সে ব্যক্তি একজন যিন্দিক (ছদ্মবেশী ধর্মদ্রোহী)। কেননা আমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল (ﷺ) সত্য এবং আল-কুরআনও সত্য। আর রাসুলুল্লাহর (ﷺ) সাহাবারাই ছিলেন সেসব ব্যক্তিত্ব যাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু এরা আমাদের সেই সাক্ষীদেরকে (সাহাবিদের) বিতর্কিত করতে চায়, যাতে করে কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্যতাকেই বাতিল ও ধূলিসাৎ করে দেওয়া যায়। অতএব, কোনো সাহাবির চেয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি অবমাননা ও ধিক্কারের যোগ্য; কারণ তারা যিন্দিক।” [আরবি]


ইমাম আবু নুআইম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: [৬]

“কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই আল্লাহর রাসুল (ﷺ)-এর সাহাবিদের পদস্খলন ও ভুলত্রুটির অনুসন্ধান করে কিংবা তাঁদের ওপর তীব্র ক্রোধের কারণে ও তাঁদের প্রতি মানসিকভাবে হতাশা কাজ করার কারণে তাঁদের থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে যাওয়া বিচ্যুতিগুলোকে তাঁদের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করে থাকে যার অন্তর দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনাহয় পতিত হয়েছে।” [আরবি]


ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: [৭]

“যখন দেখবে কোনো ব্যক্তি সাহাবাদের কাউকে মন্দ বা কটুভাবে উল্লেখ করছে, তখন তার ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করো।” [আরবি] [৮]


তথ্যসূত্র:
[১] আল-হাফিয আল-মিযযির তাহযিব আল-কামাল (1/339)
[২] আত-তারিখে খাতিব আল-বাগদাদি কর্তৃক বর্ণিত (১০/১৭৫)
[৩] মুহাম্মাদ খালিল হাররাসের শারহুল আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ (পৃ. ১৭৩)
[৪] ইবনু তাইমিয়্যাহর আস-সারিমুল মাসলুল (পৃ. ৫৮০)
[৫] খাতিব আল-বাগদাদির আল-কিফায়াহ (পৃ. ৯৭)
[৬] আবু নুয়াইমের তাসবিত আল-ইমামাহ ওয়া তারতিব আল-খিলাফাহ (পৃ. ৩৪৪)
[৭] ইবনু কাসিরের আল-বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ (৮/১৪২)
[৮] অর্থাৎ, তা এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ যে ঐ ব্যক্তির অন্তরে ইসলামের প্রতি গভীর বিদ্বেষ বা শয়তানি অভিপ্রায় লুকিয়ে রয়েছে।
সূত্র: abuiyaad.com

পূর্ববর্তী পোস্ট
কোনো কমেন্ট নেই
কমেন্ট করুন
comment url