রাফিদাহ-শিয়াদের ডেভিল’স ডিসেপশন - তাদের নিজেদের উৎস থেকে তাদের আকিদাহ-বিশ্বাস সম্পর্কে জানুন

সালাফি দাওয়াহ বাংলা

আর্টিকেলটি ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়।

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক এবং সকল সৃষ্টির রব। শান্তি ও বারাকাহ বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসূল মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, তাঁর সাহাবাগণ এবং কিয়ামাত পর্যন্ত যারা তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের সবার ওপর।

১. সুন্নি

বি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিমদের নেতৃত্ব কে গ্রহণ করবেন এবং কাকে এই দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রদান করা হবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ দেখা দেয়। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবাগণ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন যে, শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহই জনগণকে পথনির্দেশ দেওয়ার অধিকার রাখে। তাঁরা সুন্নাহর পর্যালোচনা করার পর সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আবু বকর আস-সিদ্দিককেই (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন হবে, আর তিনি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী তাঁদের শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। এভাবেই তিনি প্রথম খলিফা নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উমার ইবনুল খাত্তাবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মনোনীত করেন। তৃতীয় খলিফা হিসেবে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশিষ্ট সাহাবাদের ছয় সদস্যের একটি পরিষদ উসমান ইবনু আফফানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নির্বাচিত করেছিলেন, যাদেরকে ইন্তেকালের আগে উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই মনোনীত করে গিয়েছিলেন। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাতের পর চতুর্থ খলিফা হিসেবে আলি ইবনু আবি তালিবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিশিষ্ট সাহাবারাই দায়িত্ব প্রদান করেন। আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পূর্ববর্তী তিন খলিফার প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন এবং আন্তরিকভাবে তাদের সমর্থন করেন। এমনকি তিনি নিজ সন্তানদের নামও তাদের নামে রাখেন।


কতিপয় সহিহ হাদিস অনুযায়ী মুসলিমদের মধ্যে ৭৩টি ফিরকাহ বিদ্যমান। এর মধ্যে শুধু একটি ফিরকাই সঠিক বলে স্বীকৃত। আর তারা হলো যারা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অনুসরণ করে। এই দলটি ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’ (সুন্নাহ ও সাহাবাদের মূলধারার অনুসারী), অথবা ‘আহলুস হাদিস’ (হাদিসের অনুসারী) কিংবা ‘সালাফি’ (সৎকর্মপরায়ণ পূর্বসূরীদের অনুসারী) নামে পরিচিত – এ নামগুলো পরস্পর সমার্থক।

সত্যিকারার্থেই কোন ফিরকাটি সঠিক এ নিয়ে মুসলিমদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। সুন্নি (বা সালাফি) তারাই যারা নবিজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহ ও সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) পথের অনুসরণ করে—সুতরাং যারা সঠিকভাবে তা করে তারাই নাজাতপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। খলিফারা আইন প্রণেতা ছিলেন না; বরং তারা ওয়াহি থেকেই বিধান গ্রহণ করতেন; তাঁরা এমন নেতা ছিলেন যারা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। কুরআন ও সুন্নাহর গবেষণালব্ধ ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সাহাবাহ এবং তাঁদের পরবর্তী ফকিহগণ আইন (শরিয়াহ) প্রয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন—অনেক শারঈ অবস্থানে তাঁরা একমত হয়েছিলেন, আবার কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে নিজ নিজ বোধগম্যতার ভিত্তিতে কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভিন্নতাও ছিল, কিন্তু সর্বোপরি মূলনীতি ও মৌলিক বিষয়গুলো ছিল এক ও অভিন্ন। আহলুস সুন্নাহ (অর্থাৎ, সুন্নিরা) আমল করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সহিহ হাদিস গ্রহণ করে এবং সহিহ নয় এমন হাদিস বর্জন করে। তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহয় অনুপস্থিত এমন নতুন উদ্ভাবিত কর্মপদ্ধতি (বিদআত) থেকে দূরে থাকে।

২. শিয়া

নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের কয়েক দশক পর একটি সংখ্যালঘু ফিরকাহর আবির্ভাব ঘটে, যারা দাবি করে বসে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলি ইবনু আবি তালিবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে মনোনীত করে গেছেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেহেতু নবিজির চাচাতো ভাই ও জামাতা ছিলেন, তাই সাহাবারা আলিকে প্রথম খলিফা নিযুক্ত না করে ভুল করেছিলেন। কিন্তু শিয়ারা যখন এই দাবি তুললো, তখন যেসব সাহাবি জীবিত ছিলেন, খোদ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ তারা তাদের এই মতবাদ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

  • শিয়ারা বিশ্বাস করে, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর স্ত্রী ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পরেও আল্লাহর কাছ থেকে সংবাদ পেতে থাকেন।
  • তারা বিশ্বাস করে, গুটিকয়েক সাহাবি ছাড়া বাকি সবাই বিশ্বাসঘাতক ও যিন্দিক (ধর্মত্যাগী) হয়ে গিয়েছিলেন।
  • তারা বিশ্বাস করে যে, আলি, ফাতিমা ও তাঁদের পুত্রগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ইলাহি (আল্লাহর) গুণে গুণান্বিত, তাই তারা সাহায্য ও বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য তাঁদেরকে ডাকে এবং তাঁদের কাছে প্রার্থনা করে।
  • তারা আরও বিশ্বাস করে, কুরআনের একটি সূরা আছে যার নাম ‘সূরা আল-উইলায়াহ’, যা আলিকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে, এবং সাহাবারা ইচ্ছাকৃতভাবে সেটি কুরআন থেকে বাদ দিয়েছেন।
  • প্রসিদ্ধ শিয়া ধর্মগুরু আল-কুলাইনি রচিত ‘উসুলুল কাফি’ গ্রন্থে এসব মতবাদের পাশাপাশি আরও বহু বিষয়ের উল্লেখ আছে।
  • তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ইমামরা (নেতা) আল্লাহর পাশাপাশি আইন প্রণয়নের অধিকার রাখে।
  • শিয়ারা বিশ্বাস করে, প্রত্যেক ইমাম তার মৃত্যুর পূর্বে পরবর্তী ইমামকে মনোনীত করে যায়।
  • শিয়া শব্দের অর্থ দল (ফিরকাহ), এবং তারা নিজেদেরকে ‘আলির দল’ বলে বিশ্বাস করে।
  • তারা শুধুমাত্র সেই ধর্মীয় বিধানগুলো মেনে চলে যা তাদের ইমামদের কাছ থেকে এসেছে বা তাদের ইমাম কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়েছে।
  • তারা প্রথম তিন খলিফাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে এবং বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আহমাদ, মালিক, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ প্রমুখ বর্ণিত হাদিস ও ইসনাদকে (বর্ণনাসূত্র) অস্বীকার করে।

নিচে শিয়াদের বারো ইমামের তালিকা দেওয়া হলো যাদেরকে তারা ইলাহি গুণে গুণান্বিত বলে বিশ্বাস করে এবং তাদের কাছে দোয়া করে:

     ১. আলি (মৃ. ৪০ হি.)
     ২. হাসান (মৃ. ৬১ হি.)
     ৩. হুসাইন (মৃ. ৬৯ হি.)
     ৪. আলি (মৃ. ৯৫ হি.)
     ৫. মুহাম্মাদ (মৃ. ১১৪ হি.)
     ৬. জাফর (মৃ. ১৪৮ হি.)
     ৭. মুসা (মৃ. ১৮৩ হি.)
     ৮. আলি (মৃ. ২০৩ হি.)
     ৯. মুহাম্মাদ (মৃ. ২২০ হি.)
     ১০. আলি (মৃ. ২৫৪ হি.)
     ১১. হাসান (মৃ. ২৬০ হি.)
     ১২. মুহাম্মাদ আল-মাহদি (গায়েবি ইমাম)

শিয়ারা বিশ্বাস করে, গায়েবি ইমাম তাদেরকে আজও পথনির্দেশ দিচ্ছে। তাদের মতে, বহু শতাব্দী আগে অলৌকিকভাবে শৈশবে গায়েবি ইমাম ভূগর্ভে চলে যায় এবং শিয়া মতাবলম্বী আলিমদের সাথে যোগাযোগ রাখে। ইরানে শিয়ারা গায়েবি ইমামের প্রত্যাবর্তনের জন্য দোয়া করে। ইরানি ধর্মীয় নেতাদের “আয়াতুল্লাহ” বলা হয় এবং তাদেরকে গায়েবি ইমামের মুখপাত্র বলে মনে করা হয়।

নেতৃত্ব ও ইবাদাহর ধারণায় সুন্নি মতবাদ শিয়া মতবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুন্নিদের মাঝে ‘ইমাম’ শব্দটির প্রচলন রয়েছে, তবে তা পিরালি বা ইলাহি কোনোকিছুর সাথে সম্পর্কিত নয়। তা যেকোনো মুসলিম শাসক, আলিম বা সালাতে ইমামতি করেন এমন ব্যক্তিকে বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। আহলুস সুন্নাহ সামগ্রিক নেতাকে ‘খলিফা’ বলে অভিহিত করে। এর চেয়ে নিম্নস্তরের নেতাকে ‘রাজা-বাদশাহ’, ‘প্রেসিডেন্ট’, ‘আমির’ বা ‘সুলতান’ নামে ডাকা হয় – আহলুস সুন্নাহ এদেরকে বৈধ শাসক মনে করে, এমনকি তারা পাপাচারী বা অত্যাচারীও যদি হয়। সহিহ হাদিস অনুযায়ী এসব মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিষিদ্ধ।

শিয়াদের কিছু উক্তি:


  • “আল্লাহর গুণে গুণান্বিত ইমামদের আনুগত্য করা যেন আল্লাহরই আনুগত্য করা। ইমামের অবাধ্য হওয়া আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার নামান্তর।”
  • “যে ব্যক্তি তার নিজ সময়ের ইমামকে না চেনা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে একজন কাফির (অবিশ্বাসী) অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।”
  • “প্রত্যেক ইমাম নিষ্পাপ এবং আল্লাহ পক্ষ থেকে হিদায়াতপ্রাপ্ত।”
  • “ইমামরা পুরো দুনিয়ার জ্ঞান রাখে।”
  • “ইমামরা নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ।”

রাফিদাহ শিয়া (বারো ইমামি ও ইসনা আশারিয়াহ)

রাফিদাহ শব্দটি আবু বকর ও উমারের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) প্রত্যাখ্যানকারীদের বুঝাতে শিয়া সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ফিরকাহকে দেওয়া উপাধি যারা নিজেদেরকে ‘ইসনা আশারিয়াহ’ (বারো ইমামি) বলে পরিচয় দেয়। তাদের বহু বিশ্বাস রয়েছে যা আহলুস সুন্নাহর আকিদাহর সম্পূর্ণ বিপরীত।

আহলুস সুন্নাহ ও রাফিদাহদের মধ্যে পার্থক্য মূলত ঈমান ও আকিদাহর মৌলিক বিষয়গুলোতেই। আহলুস সুন্নাহর উলামারা মনে করেন, বারো ইমামিদের মতাদর্শে শির্‌কের এমন উপাদান রয়েছে যা একজন ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। এর সাথে রয়েছে সুন্নি মুসলিমদের প্রতি তাদের ধর্মীয় শত্রুতা, যা ইতিহাসজুড়ে আজ অবধি লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং তাদের মূল গ্রন্থসমূহে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।

এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, সাধারণ মানুষদের অনেকেই যারা কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা রাখে এবং কল্যাণ কামনা করে, তারা শিয়াদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও শির্‌কি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত নয়, এবং এর একটি কারণ হলো, শিয়া ধর্মগুরুরা তাদের মতাদর্শের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া মৌলিক গ্রন্থগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রচার হতে দেয় না।

শিয়াদের সবচেয়ে বড় শাখা হলো ইসনা আশারিয়াহ (বারো ইমামি)। তাদেরকে রাফিদাহ (প্রত্যাখ্যানকারী) নামে অভিহিত করা হয় কারণ তারা প্রথম দুই খলিফা আবু বকর ও উমার এবং নবিজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যান্য সাহাবিদেরকে প্রত্যাখ্যান করে।

তাই, এখানে আমরা শিয়াদের কিছু আকিদাহ-বিশ্বাস উল্লেখ করছি যা তারা তাদের নিজেদের রেফারেন্স বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছে:


১. শিয়াদের বারো ইমাম সম্পর্কিত আকিদাহ

প্রসিদ্ধ শিয়া ধর্মগুরু আল-কুলাইনি তার উসুলুল কাফি (১/২৫৮-২৬০) গ্রন্থে বর্ণনা করেছে:

“ইমামরা কোনো কিছু জানতে চাইলে তা জানতে পারেন। তারা জানেন কখন তাদের মৃত্যু হবে—এবং তাদের কেউই মৃত্যুবরণ করেন না, যদি না তিনি নিজেই তা ইচ্ছা করেন।”

আল-কুলাইনির এই গ্রন্থটি শিয়াদের কাছে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গৃহীত — মূলত, শিয়াদের কাছে এর মর্যাদা তেমনই যেমন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর কাছে সহিহ আল-বুখারির। শিয়ারা এই ইমামদেরকে ইলাহি গুণে গুণান্বিত বলে মনে করে এবং তাদের এমনভাবে ডাকে ও তাদের কাছে দোয়া করে যেভাবে একমাত্র আল্লাহকে ডাকা ও আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। তাদের একজন আলিম হাশিম আল-বাহরানি তার ‘ইয়ানাবিউল মাআজিজ ওয়া উসুলুদ দালাইল’ (৫ম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬) গ্রন্থে শিয়াদের বারো ইমাম সম্পর্কে বলেছে:

“তারা জানেন আকাশমণ্ডলীতে কী আছে এবং পৃথিবীর ভূগর্ভে কী আছে, তাদের কাছে অতীতের জ্ঞান আছে এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানও আছে, তারা জানেন রাতে ও দিনে কী ঘটে এবং প্রতিটি মুহূর্তে কী ঘটবে — এবং তাদের কাছে নবিগণের জ্ঞান রয়েছে, বরং তার চেয়েও অধিক জ্ঞান তাদের রয়েছে।”

তাদেরই এ যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ শাইখ, আব্দুল মুহসিন আল-আমিনি আন-নাজাফি তার ‘আল-গাদির’ (১/২১৪-২১৬) গ্রন্থে বলেছে:

“নিশ্চয়ই (বারো) ইমামগণ হলেন আল্লাহর পুত্র এবং আলির বংশধর।”

তারা তাদের লেখালেখি ও বক্তৃতায় আরও বলেছে:

“নিশ্চয়ই মাহদি আল-মুনতাযির (বারোতম গায়েবি ইমাম) মাত্র পাঁচ বছর বয়সে একটি গর্তের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন, অথচ তিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমাণুতে কী ঘটছে তা জানেন!”


২. মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সম্পর্কে শিয়া আকিদাহ

রাফিদিরা দাবি করে যে, আহলুস সুন্নাহর কাছে যে কুরআন রয়েছে তা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর নাযিলকৃত কুরআন নয়। তারা দাবি করে, এতে পরিবর্তন, বিকৃতি ও সংযোজন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের অধিকাংশ ধর্মগুরু ও আলিম বিশ্বাস করে, আসল কুরআনে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, যেমনটি তাদের ধর্মগুরু আন-নুরি আত-তাবরিসি (মৃ. ১৩২০ হি.) তার ‘ফাসলুল খিতাব ফি ইসবাতি তাহরিফি কিতাবিল আরবাব’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

আল-কুলাইনি ‘উসুলুল কাফি’ (২/২৪২) গ্রন্থে বর্ণনা করেছে, জিবরিল (আলাইহিস সালাম) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে যে কুরআন নিয়ে এসেছিলেন তাতে ১৭,০০০ আয়াত ছিল। এর অর্থ হলো, রাফিদাহরা যে কুরআন নাযিল হয়েছে বলে দাবি করে, তা আজ আমাদের কাছে থাকা কুরআন থেকে অনেক বড়ো; কারণ আমাদের কাছে আজ যে কুরআন রয়েছে তাতে মোট আয়াতের সংখ্যা মাত্র ৬,০০০-এর কিছু বেশি। এবং আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন:

“নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরা অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর ১৫:৯]

এমনকি কুরআনের তাফসিরের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও ভ্রান্তিতে পূর্ণ, কারণ তারা তাদের নিজেদের খেয়ালখুশি ও গোঁড়া মতাদর্শ অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা করে। তাদের আলিম আস-সাফি তার তাফসির গ্রন্থে (১/১৫৬, ৩৬১) আল্লাহর নিম্নোক্ত কালামের ব্যাখ্যায় বলেছে:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শির্‌ক করাকে ক্ষমা করেন না।”

আস-সাফি বলেছে:

“অর্থাৎ: তিনি তাদের ক্ষমা করবেন না যারা আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) (প্রথম ও চিরস্থায়ী খলিফা হওয়ার) অধিকারকে অস্বীকার করে।” আর আল্লাহর বাণী:

وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

“আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন।”

অর্থাৎ: যে ব্যক্তি আলির (প্রথম বৈধ খলিফা হিসেবে) আনুগত্যের বাইআহ গ্রহণ করে।”

তাদের নিজেদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যায় বিকৃতির আরও কিছু উদাহরণ নিম্নরূপ: আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

“আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওয়াহি করা হয়েছে যে, ‘যদি আপনি শির্‌ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [৩৯:৬৫]

কুরআনের শিয়া মুফাসসিররা বলেছে:

“যদি তোমরা কারো আনুগত্যকে আলির আনুগত্যের সাথে শির্‌ক করো, তাহলে তোমাদের সকল আমল নিশ্চয়ই বরবাদ হয়ে যাবে এবং তোমরা নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [তাফসির আস-সাফি, ১/১৫৬, ৩৬১; তাফসির নুর আস-সাকালাইন, ১/১৫১, ৪৮৮]

আল্লাহর বাণী:

يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ

“তারা জিব্‌ত ও তাগূতে বিশ্বাস করে।” [৪:৫১]

এ আয়াত সম্পর্কে তারা তাদের তাফসির গ্রন্থসমূহে বলেছে:

“এখানে আবু বকর ও উমারের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।” [দেখুন: ফুরু আল-কাফি, মিরআতুল উকুল-এর টীকাসহ, ৪/৪১৬]

৩. আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাহ ও তাঁর স্ত্রীগণ সম্পর্কে শিয়াদের আকিদাহ

রাফিদাহদের বিশ্বাসই হলো সাহাবাদেরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) গালমন্দ করা ও অভিশাপ দেওয়া। তারা তিনজন (বা এমন আরও কয়েকজন) বাদে সব সাহাবাহকেই কাফির বলে ঘোষণা করে। শিয়া ধর্মগুরু আল-কুলাইনি তাদের সোর্স অফ রেফারেন্স ‘আল-কাফি’-তে তা উল্লেখ করেছে:

“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পর তিনজন ব্যতীত সব লোকই ধর্মত্যাগী (মুরতাদ) হয়ে গিয়েছিল। তারা হলেন: মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ, আবু যর আল-গিফারি এবং সালমান ফারসি।” [দেখুন: ‘রিজাল আল-কাশশি’, পৃষ্ঠা ৬; ‘আল-কাফি কিতাব আর-রাওদা’, ১২/৩১২, ৩২২, মাজিন্দারানির ‘শারহ জামে’-সহ]

শিয়াদের গ্রন্থ ‘মিফতাহুল জিনান’-এ আব্বাস আল-কুম্মি কর্তৃক সংকলিত একটি দোয়া রয়েছে, যা শিয়া উলামারা আবু বকর ও উমার এবং তাঁদের দুই কন্যা—নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উভয় স্ত্রী আয়িশা ও হাফসার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বিরুদ্ধে পড়ে থাকে। তারা সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াকে শরিয়াহসম্মত দোয়া হিসেবে গণ্য করে, যেটাতে তারা উচ্চারণ করে:

“হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের ওপর শান্তি বর্ষণ করুন, এবং কুরাইশের সেই দুই মূর্তি, তাদের দুই জাদুকর, তাদের দুই মিথ্যা উপাস্য এবং তাদের কলঙ্কিত কন্যাদেরও অভিশাপ দিন, যারা আপনার আদেশের বিরোধিতা করেছিলো... (ইত্যাদি)।” [রিজাল আল-কাশশি, পৃ. ১১৪]

তারা আবু বকর ও উমারকে “ফেরাউন ও হামান” নামেও অভিহিত করে [দেখুন: আল-কাশানির ‘কুরাতুল আইন’, পৃষ্ঠা ৪৩২-৪৩৩], এবং দুই মূর্তি” [তাফসির আল-আয়াশি, ২/১১৬; বিহার আল-আনওয়ার, পৃ. ৫৮, ৬৭] এবং “লাত ও উযযা” [ইবনু বাবাওয়াইহ আল-কুম্মির ‘ইকমালুদ দীন’, পৃ.২৪৬; আবুল হাসান আল-আমালির মুকাদ্দিমাতুল বুরহান, পৃষ্ঠা ২৯৪] এসব নামেও ডাকে।

শিয়া ধর্মগুরুরা সাহাবাদের বিরুদ্ধে তাদের জঘন্য আক্রমণে অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। তারা সুস্পষ্টভাবে বলে যে, তাদের ‘প্রতীক্ষিত মাহদি’ (গায়েবি ইমাম) আবু বকর ও উমারকে জীবিত করে এনে খেজুর গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেবে এবং বার বার প্রতিদিন হাজার বার করে তাদের হত্যা করতে থাকবে। [দেখুন: হুরর আল-আমিলির ‘ইকাজ মিনাল হুজআহ বি তাফসির আল-বুরহান আলার-রুজআহ’, পৃ. ২৮৭]

৪. আহলুস সুন্নাহর ব্যাপারে তাদের আকিদাহ

রাফিদাহ শিয়া মতবাদ শেখায় যে, একজন সুন্নির সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ এবং তার রক্তপাত করাও বৈধ। তাদের গ্রন্থ, আল-জাযাইরির ‘আল-আনওয়ার আন-নুমানিয়্যাহ’-তে (২/২০৬-২০৭) উল্লেখ করা হয়েছে, “শিয়া উলামাদের ইজমা (ঐকমত্য) অনুযায়ী আহলুস সুন্নাহ অপবিত্র ও নাপাক কাফির এবং তারা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের চেয়েও নিকৃষ্ট।”

কোনো কোনো গ্রন্থে বলা হয়েছে, আহলুস সুন্নাহদের হত্যা করা বৈধ, যাদের তারা “নাসিবি” নামে ডাকে, কারণ তাদের (ভ্রান্ত) ধারণা অনুযায়ী সুন্নিরা আলি ইবনু আবি তালিবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ঘৃণা করে। তারা বলে যে, সুন্নিকে ডুবিয়ে, দেওয়ালের নিচে চাপা দিয়ে বা অন্য যেকোনো গোপন পদ্ধতিতে হত্যা করা যেতে পারে, যাতে শিয়া হত্যাকারী ধরা না পড়ে যায়। শিয়াদের এই আকিদাহগুলো তাদের গ্রন্থেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। [দেখুন: রিজাল আল-কাশশি, পৃষ্ঠা ৫২৯; তাহজিব আল-আহকাম, ১/৩৮৪; ওয়াসাইল আশ-শিয়া, ৬/৩৪০]

৫. রাফিদাহ শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, তারা যে রবের ইবাদাহ করে, তিনি সেই রব নন যাঁর ইবাদাহ আহলুস সুন্নাহ করে

শিয়াদের প্রধান আলিম ও ধর্মগুরুদের একজন, নিমাতুল্লাহ আল-জাযাইরি তার ‘আল-আনওয়ার আন-নুমানিয়্যাহ’ (২/২৭৮-২৭৯) গ্রন্থে বলেছে:

“আমরা তাদের (অর্থাৎ, আহলুস সুন্নাহর) সাথে ইবাদাতকৃত উপাস্যের বিষয়ে একমত নই, না নবির বিষয়ে একমত, না ইমামের বিষয়ে। এবং এর কারণ হলো, তারা (আহলুস সুন্নাহ) বলে যে, তাদের প্রতিপালক হলেন তিনি, যাঁর নবি মুহাম্মাদ এবং খলিফা আবু বকর, আর আমরা এমন কোনো রবকে চিনি না, এমন কোনো নবিকেও চিনি না। বরং আমরা বলি: নিশ্চয়ই সেই প্রতিপালক যিনি আবু বকরকে তাঁর নবির খলিফা বানিয়েছেন, তিনি আমাদের প্রতিপালক নন, এবং এমন নবি আমাদের নবি নন!”

এটা সম্ভব যে, কিছু অজ্ঞ শিয়া থাকতে পারে যারা নিজেদেরকে শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিচয় দেয়, অথবা নিজেদেরকে জাফরি বা বারো ইমামি বলে, অথচ তারা তাদের এই সম্প্রদায়ের প্রকৃত আকিদাহ-বিশ্বাস সম্পর্কে জানে না। সুতরাং, তাদের কর্তব্য হলো শিয়া সম্প্রদায়ের পথভ্রষ্টতা উপলব্ধি করা এবং তা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করা, এবং ঘৃণাজীবী শিয়া মতবাদের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত না রাখা। নিশ্চয়ই, কোনো ধর্ম তার উৎসগ্রন্থের মাধ্যমেই পরিচিত হয়, এর অজ্ঞ অনুসারীদের দ্বারা নয় যারা পড়াশোনা করেনি। আমরা এখানে শিয়াদের আকিদাহ তাদেরই রেফারেন্স বই থেকে উদ্ধৃত করেছি, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক। এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও বারাকাহ বর্ষিত হোক আমাদের নবি মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার-পরিজন, তাঁর সকল সাহাবি ও সত্যিকার অনুসারীদের ওপর।

আরও জানতে ভিজিট করুন: www.shia.bs


সোর্স: abukhadeejah.com
পূর্ববর্তী পোস্ট
কোনো কমেন্ট নেই
কমেন্ট করুন
comment url