খারিজি আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসি: ‘আমাদের মহান শিক্ষক, শাইখ ও মুজাহিদ সাইয়িদ কুতুব’

সালাফি দাওয়াহ বাংলা

পটভূমি: সাইয়িদ কুতুব আবু আলা আল-মাওদুদির লেখালেখি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল এবং কারাগারে বন্দি থাকাকালীন তার অনুসারীদের আল-মাওদুদির প্রখ্যাত রচনা ‘চার পরিভাষা’ (Four Terms) অধ্যয়ন করতে উৎসাহ দিতো। কুতুব আল-মাওদুদির চিন্তার কেন্দ্রীয় ধারণা—বিধানদান বা আইনপ্রণয়ন (হাকিমিয়্যাহ) ও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব (সুলতাহ)[১]—গ্রহণ করে এবং একে আরও বিকশিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ খারিজি মতবাদ ও পদ্ধতিতে রূপদান করে। ১৯৫২ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের (Socialist Revolution) পর ফ্রি অফিসারদের সঙ্গে তার সম্পর্কচ্ছেদের পটভূমিতে এর চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটে। জামাল আবদুন নাসেরের (Jamāl ʿAbd al-Nāṣir) নেতৃত্বে সংঘটিত সেই বিপ্লব ও তার ক্ষমতা অর্জনে কুতুবের কিছুটা সম্পৃক্ততা থাকলেও, পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায় এবং নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় সে ‘ফি যিলালিল কুরআন’ (আয-যিলাল)-এ তার ক্ষুব্ধ ও ঘৃণাপূর্ণ মতবাদগুলো লিখতে শুরু করে। সেখানে সে মিশরীয় সমাজসহ পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম সমাজকেও তাকফির (কাফির ঘোষণা) করে এবং ধ্বংসাত্মক বিপ্লবের আহ্বান জানায়। তার এই দাবির সপক্ষে মূল যুক্তি ছিল, আল-মাওদুদির মতবাদ অনুযায়ী, এ সমাজগুলো আল্লাহর ‘হাকিমিয়্যাহ’ ও ‘সুলতাহ’ কেড়ে নিয়েছে এবং প্রাচীন ফিরাউনের (Pharaoh) মতো অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। আর এসব সমাজের জনগণ, তারা যতোই সন্তুষ্ট কিংবা উদাসীন থাকুক না কেন, এমন এক সমাজে বসবাস করছে যেখানে ঈমানের সবচেয়ে মৌলিক উপাদান ‘হাকিমিয়্যাহ’ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত; ফলে তারাও কাফির ও মুরতাদ বলে গণ্য হবে। সুতরাং, এ সমাজগুলোর বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক বিপ্লব (General Revolution) ছাড়া আর কোনো উপায়েই এ পরিস্থিতির সংশোধন সম্ভব নয়। পথভ্রষ্ট খারিজি ও আদর্শগত জঙ্গি (Terrorist) আবু মুহাম্মাদ ইসাম/আসিম আল-বারকাওয়ি আল-মাকদিসি[২]—তার নিজ স্বীকারোক্তি অনুযায়ী—আফগানিস্তানে অবস্থানকালে মিশরীয় তাকফিরি খারিজি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সাইয়িদ কুতুব ও আল-মাওদুদির বইপত্রের মাধ্যমে লালিত-পালিত ও পুষ্ট হয়েছিল। যেমন সে বলেছে: “যে ভাইয়েরা আমাদের ‘আয-যিলাল’, ‘মাইলস্টোনস’ এবং সাইয়িদ কুতুব, তার ভাই [মুহাম্মাদ কুতুব] ও আল-মাওদুদির অন্যান্য বইপত্রের মাধ্যমে ‘স্তন্যপুষ্ট’ (Breastfed) করে গড়ে তুলেছেন—তাদের সঙ্গে লালিত-পালিত হওয়ার বা বেড়ে ওঠার সেই প্রাথমিক সময়ে আমি (আমাদের) হিদায়াহর সূচনাকালকেই বুঝিয়ে থাকি।” [৩]

এবিষয়ে সালাফি উলামাদের অবস্থান (মাওকিফ) অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুসংহত। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের আগে সালাফি কিবারুল উলামাদের অনেকেই সাইয়িদ কুতুবের বইপত্র বা রচনাবলি ব্যাপকভাবে পাঠ করেননি। শাইখ আবদুল্লাহ আদ-দুওয়াইশ সর্বপ্রথম কুতুবের রচনার সমালোচনা করেন এবং তাঁর বহু মারাত্মক আকিদাগত ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে তুলে ধরেন। আকিদাহর ক্ষেত্রে কুতুব ছিল একজন জাহমি-আশআরি মতবাদে বিশ্বাসী, মানহাজে ছিল খারিজি, নিজের কুরআনের তাফসিরের কয়েকটি স্থানে ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (সর্বেশ্বরবাদ)-এর কথা উল্লেখ করেছে, একাধিক আম্বিয়াদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও বিদ্রূপ করেছে, কিছু সাহাবিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কার করেছে, উসমানের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে সংঘটিত বিদ্রোহের বা বিপ্লবের প্রশংসা করেছে—এমন আরও অসংখ্য বিপর্যয় সে ঘটিয়েছে। পরবর্তীতে শাইখ রাবি ধারাবাহিক কয়েকটি গ্রন্থ রচনার (Series of Books) মাধ্যমে সাইয়িদ কুতুবের এসব বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতাকে আরও ব্যাপক পরিসরে উন্মোচন করেন।

২০০০ এর দশক নাগাদ ইখওয়ানি, তাকফিরি, কুতবি এবং খারিজিদের সাধারণ অংশ কুতুবের বইপত্র প্রচার করতে ভয় পেতো; কারণ ততদিনে বাস্তবতা সবার সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন বলেছেন: “তাকওয়া বা আল্লাহভীতি না থাকলে আমরা তাকে (কুতুবকে) তাকফির (কাফির বলে ঘোষণা) করতাম।” শাইখ ইবনু বায মন্তব্য করেন: “নবিদের বিদ্রূপ করাই একটি স্বতন্ত্র ইরতিদাদ (ধর্মত্যাগ)।” আর শাইখ আল-আলবানি শাইখ রাবির সংকলিত রচনাবলির প্রশংসা করেন এবং তাঁকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন: “তাই আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন, রাবি ভাই আমার, কারণ আপনি তার (কুতুবের) অজ্ঞতা ও ইসলাম থেকে বিচ্যুতির স্বরূপ ব্যাখ্যা ও উন্মোচন করার ওয়াজিব দায়িত্ব পালন করেছেন।”

একইভাবে অন্য সালাফি উলামাদের একটি বড়ো অংশ এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। অবশেষে এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাইয়িদ কুতুব ছিল একজন চরম ভ্রষ্ট, বিভ্রান্ত, রাফিদি, খারিজি; যে বিংশ শতাব্দীর আধুনিক খারিজি আন্দোলনগুলোর আবির্ভাবের জন্য দায়ী। এর ফলে আব্দুর রাহমান আব্দুল খালিকের মতো কতিপয় ব্যক্তিত্ব এবং সৌদি আরবের কুতবিয়্যাহ গোষ্ঠী—যাদেরকে মুহাম্মাদ কুতুব (সাইয়িদ কুতুবের ভাই) পরিচালনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দীক্ষা দিয়েছিল—কুতুবের খারিজি মতবাদকে ‘সালাফিকরণ’ (Salafization) করার যে প্রতারণামূলক অপচেষ্টা চালিয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটের গুণে আজ কোনো পথভ্রষ্ট, খারিজি ব্যক্তিকে কেবল সাইয়িদ কুতুব সম্পর্কে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও মতামত বিশ্লেষণ করলেই অত্যন্ত সহজেই চিনে ফেলা সম্ভব। পক্ষান্তরে, পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ (Orientalists) ও অ্যাকাডেমিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা মূলত খারিজি প্রচারণামূলক ফাঁদ বা প্রোপাগান্ডার শিকার। তারা আশি ও নব্বইয়ের দশকে সালাফিজমকে খারিজি মতবাদ ও কর্মপদ্ধতির (মানহাজ) সাথে মিশিয়ে ফেলতে চাওয়া পথভ্রষ্ট খারিজিদের সেই নির্দিষ্ট ‘চক্রের’ (Layer) কাছ থেকেই গ্রহণ করেছে, তখন যাদের এই অপতৎপরতা ছিল তুঙ্গে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আব্দুর রাহমান আবদুল খালিক, মুহাম্মাদ কুতুব, মুহাম্মাদ সুরুর, আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসি, আবু কাতাদাহ এবং তাদের সমমনা আরও অনেকে।

খারিজি আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসির কুতুবের পক্ষে সাফাই: আল-মাকদিসি তার ওয়েবসাইটে পাওয়া একটি প্রশ্নের জবাবে প্রকাশিত এক লেখায় ‘সালাফিজমের দাবিদারদের’ প্রতি ইঙ্গিত করেছে, যারা সাইয়িদ কুতুবকে আক্রমণ করে। আল-মাকদিসির সেই জবাবে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি এসেছে [৪]: “শাইখ, মুজাহিদ ও সম্মানিত লেখক, আমাদের মহান শিক্ষক সাইয়িদ কুতুব—আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি রহম করুন—সম্পর্কে বলবো, বর্তমান যুগের একটি অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যদিও এই অদ্ভুত বিষয়ের কোনো প্রয়োজনই ছিল না, আমার মতো ব্যক্তির কাছে সাইয়িদ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হচ্ছে, যেন আমি তাঁর প্রশংসা বা নিন্দা করি। অথচ তিনি তো সেই ব্যক্তি, যিনি দুনিয়ার চাকচিক্য, এর ধ্বংসাবশেষ এবং তুচ্ছ বস্তুসামগ্রী থেকে বহু ঊর্ধ্বে থেকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন—যেগুলোর প্রতি মানুষ ঝুঁকে পড়ে এবং (এর মোহে বা এসবের পেছনে ছুঁটতে গিয়ে) ধ্বংস হয়ে যায়, যা মিথ্যা উপাস্যরা (অর্থাৎ, শাসকরা) তাদের দেয়, যাদের প্রতি তারা বিনীত ও অনুগত থাকে।” এরপর সে সাইয়িদ কুতুবের সমালোচকদের বিরুদ্ধে তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের সাফাই গাইতে থাকে এবং মূলত তাদের বিরুদ্ধে ‘তাওয়াগিতদের’ ইবাদাহ বা উপাসনা করার অভিযোগ তোলে। সে আরও বলে: “আমাদের এ যুগে তাঁর মতো মানুষের দেখা পাওয়া বেশ দুর্লভ।”

এ থেকে স্পষ্ট হলো, তার নিজ ভাষ্যে, আল-মাকদিসি সাইয়িদ কুতুবের এসব বইপত্রের মাধ্যমে ‘স্তন্যপুষ্ট’ (Breastfed) হয়েছিল ও আদর্শিক দীক্ষা লাভ করেছিল; আর এটাই তার খারিজিবাদের (Khārijism) মূল উৎস। সালাফি ও তাঁদের উলামাদের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট সত্ত্বেও, অসৎ ও চতুর প্রাচ্যবিদ (Orientalists) ও পশ্চিমা অ্যাকাডেমিকদের দিক থেকে আল-মাকদিসির মতো লোকদেরকে তাদের উদ্দেশ্য নির্বিশেষে ‘সালাফিস্ট’ (Salafist) হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চলমান একটি অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অতীত ইতিহাসে বহু ভ্রান্ত দল নিজেদের মতবাদকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে, অথচ ইসলাম সে মতবাদ থেকে মুক্ত এবং ইসলামের মূল পাঠ্যসূত্র বা নুসুসের (Texts) কোথাও এর খোঁজ পাওয়া যায় না। একইভাবে, অনেকেই সালাফিজমের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত (নিসবত) করে এবং নিজেদের ‘সালাফি’ বলে দাবি করে—শুধু এ কারণে যে, তারা সালাফদের মানহাজ অনুযায়ী আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি) স্বীকার বা সাব্যস্ত করে, তাওহিদের দিকে আহ্বান জানায় বা দাওয়াহ দেয়, অথবা তাকদিরের বিভিন্ন স্তরের ওপর ঈমান রাখে ইত্যাদি। অথচ একইসাথে তারা খারিজিদের মতবাদগুলো প্রচার করে বেড়ায় এবং এমনসব বিষয়ের ভিত্তিতে করে ঢালাও বা নিঃশর্ত তাকফির (কাফির ঘোষণা) করে বসে, যা কোনো গুনাহ তো দূরের কথা, গুনাহর পর্যায়েই পড়ে না। হাকিমিয়্যাহ ও এধরনের বিষয়ে খারিজিদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের ক্ষেত্রে তারা একেবারে আদিম বা প্রথমযুগের খারিজিদের মতোই অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করে। সালাফিয়্যাহ বা সালাফিজমের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও যার আছে, তার কাছে এটি স্পষ্ট, এধরনের লোকেরা এসব বিষয়ের কারণে পথভ্রষ্ট যিন্দিক, বিদআতি, বিভ্রান্ত এবং সালাফি পন্থা থেকে সম্পূর্ণ খারিজ। তারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবিদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে—মুখে তারা যতোই দাবি করুক বা স্লোগান আওড়াক না কেন। খারিজিদের ব্যাপারে নবির আহাদিস এবং সালাফদের পথ-পদ্ধতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দিবালোকের মতো উজ্জ্বল বা পরিষ্কার। সুতরাং, যখন কারও মাঝে খারিজিদের সেই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও কর্মকাণ্ড মিলে যায়, তখন তার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেই তকমা (Label) বা হুকুম আরোপিত হয়। প্রাথমিক স্তরের বিচারবুদ্ধি-যুক্তি ও সংজ্ঞা অনুযায়ী, খারিজি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কেউ কখনোই সালাফি হতে পারে না।

যারা কোনো বিষয়ের প্রকৃত গুণাবলি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে কেবল সম্পৃক্ত তকমার ওপর নির্ভর করে কোনো বিষয়ের ওপর হুকুম নির্ধারণ করে—যেমন: কোনো ঘনীভূত (Concentrated) প্রস্রাবের বোতলে ‘আপেল জুস’ বা ফলের রসের লেবেল লাগিয়ে দিলেই তা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্লেষণের বৈধ পদ্ধতি বলে, অর্থাৎ বিশুদ্ধ পানীয় বলে বিবেচিত হতে পারে—ঠিক তেমনিভাবে পথভ্রষ্ট-বিদ্রোহী খারিজিদের গায়ে ‘সালাফিস্ট’ বা ‘শান্তিবাদী’ (Quietist)-এর লেবেল সেঁটে দেওয়াকেও যারা সঠিক মনে করে, তারা স্পষ্টত খারিজিদের প্রচারণামূলক প্রোপাগান্ডার তেলমাখা মুষ্ট্যাঘাতের (Well-Vaselined Fist) শিকারে পরিণত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ এ পরিস্থিতিতে সম্ভবত অদ্ভুত এক সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি পেয়ে থাকে।[৫]


টীকা:

[১] আল-মাওদুদি দাবি করেছিল, পূর্ববর্তী সকল জাতির শিরক বা আল্লাহর সাথে কারও অংশীদারিত্বের মূল ভিত্তি ছিল ‘তাহকিম’ ও ‘সুলতাহ’ (বিচার-ফয়সালা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কর্তৃত্ব)-এর সাথে সম্পর্কিত। তার মতে, সকল নবি-রাসুলদের দাওয়াহর মূল নির্যাস বা চেতনা মূলত ‘হাকিমিয়্যাহতেই’ (আল্লাহর বিচার ব্যবস্থা ও আইন প্রতিষ্ঠার) মাঝেই নিহিত ছিল।
[২] আবু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসি হলো আধুনিক যুগে খারিজি মতাদর্শ ও কর্মপদ্ধতি (মানহাজ) প্রচারের ক্ষেত্রে ইমাম বিন আব্দুল আযিযের (সাইয়িদ ইমাম) পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবশালী তাকফিরি খারিজি বিদ্রোহী। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আফগানিস্তানে অবস্থানকালে সে সাইয়িদ কুতুব ও আল-মাওদুদির বইপত্রের মাধ্যমে দীক্ষা লাভ করে এবং ‘জামাআতুত তাকফির’-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়। যেমনটি সে নিজেই তার ‘হিদায়াতের সূচনাকাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যা তার ধর্মীয় মতবাদের কাঠামো বিনির্মাণে বড়ো ভূমিকা রেখেছিল। কুয়েত ছেড়ে আফগানিস্তানে যাওয়ার পূর্বে সে কিছুকাল মুহাম্মাদ সুরুরের সান্নিধ্যে অধ্যয়ন করেছিল; তবে পরবর্তীতে তাদের সাথে তার বিরোধ বাঁধলে তারা তাকে নিজেদের দল থেকে বহিষ্কার করে। এরপর আফগানিস্তান থেকে ফিরে এসে সে জুহায়মানপন্থি (Juhaymānites) একটি দলের সাথে যুক্ত হয়। জুহায়মানিপন্থীদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতি। তবে তারাও তার বিরুদ্ধে তাকফিরের ক্ষেত্রে চরমপন্থার অভিযোগ তোলে এবং তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে। ফলে সে কতিপয় উগ্র সাহচার্যের (Hardcore associates) মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে মূলত এ সময়টাতেই সে খারিজিদের মতবাদের মূলভাব সংবলিত গ্রন্থগুলো রচনা করে, যেগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাসকদের তাকফির করা এবং এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে একটি (সশস্ত্র) জিহাদি রূপরেখা তৈরি করা। সে মসজিদগুলোতে ইমামদের পেছনে জামাআতের সাথে সালাত (নামাজ) আদায় করতো না; বরং তাদের একটি দল মরুভূমিতে জুমুআহর সালাত আদায় করতো। সে পুলিশ সদস্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের সম্পদ চুরি করতো। বর্ণিত আছে, কুয়েতের একটি ফাউন্ডেশন থেকে চুরির পর সে জর্ডানে পালিয়ে যায় এবং সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করে দ্বিতীয় বিয়ে করে। জর্ডানে অবস্থানকালে সে শিখ ও খ্রিস্টানদের সম্পদ এই বলে চুরি করতো যে, তাদের সম্পদ হালাল। সে কখনো কোনো সালাফি আলিমের কাছ থেকে দ্বীনি ইলম অর্জন করেনি; বরং মুহাম্মাদ সুরুর, আফগানিস্তানের তাকফিরি জামাআত ও জুহায়মানিপন্থিদের সাথেই ছিল তার বেড়ে ওঠা ও যতো দীক্ষা। সে নিজেকে তাওহিদের দাওয়াহর শাইখদের গ্রন্থাবলি, যেমন—‘আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ’র ওপর একজন বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করে থাকে। অথচ সে কখনো কোনো যোগ্য ও সত্যিকার সালাফি আলিমের কাছ থেকে এসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করেনি। বরং সে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণে এবং নিজের মতবাদ প্রচারে যতটুকু সহায়ক হয় কেবল ততটুকুই এসব কিতাব থেকে গ্রহণ করে। অথচ যেসব বক্তব্য তাদের সামগ্রিক (Generalised) বা প্রাসঙ্গিকভাবে সীমিত (Contextually limited) বক্তব্যকে স্পষ্ট করে ও বিস্তারিত তুলে ধরে, সেগুলোর দিকে সে কখনোই ফিরে তাকায় না। তার চরিত্রের মূল্যায়ন হলো, সে আত্মম্ভরি ও আত্মমুগ্ধ, অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত (Volatile) এবং এমন এক ভাব ধরে, যেন সে দাওয়াহর শাইখদের কিতাবাদির সব গভীরভাবে চষে বেড়িয়েছে এবং শুধু সেই সেগুলোর সঠিক মর্মার্থ বুঝতে পেরেছে। সে একজন চিহ্নিত মিথ্যাবাদী, স্পষ্ট না করে কথায় কথায় নানা ধরনের বক্র ইঙ্গিত প্রদান করে এবং নিজের প্রকৃত আকিদাহ-বিশ্বাস লুকিয়ে রাখার জন্য কুখ্যাত। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: তাবদিদু কাওয়াশিফুল আনিদ ফি তাকফিরিহি লি দাওলাহ আত-তাওহিদ, ১৪২৮ হিজরি, পৃ. ১৭-২৬
[৩] মিযান আল-ইতিদাল, পৃ. ৫
[৪] লেখাটি আল-মাকদিসির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটের অন্যান্য বিভিন্ন ফোরামেও তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল

পূর্ববর্তী
কোনো মন্তব্য নেই
মন্তব্য লিখুন
comment url